নোটিশ
আপনি কি ব্লগ কিংবা ফেসবুকে ইসলাম এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে আগ্রহী?
তাহলে আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ দিন। ধন্যবাদ
Showing posts with label ISLAMI NEWS. Show all posts
Showing posts with label ISLAMI NEWS. Show all posts

Tuesday, December 12, 2017

জাতির এই দুর্দিনে মুফতী আমিনীকে খুব মনে পড়ে


আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নই। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আমার স্বভাবগত বিষয় নয়। কিন্তু মাওলানা আমিনীর মৃত্যু আমাকে বিদগ্ধ করেছে। কারণ, তিনি আমার সিনিয়র সাথী ছিলেন। কিন্তু পরে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে জামিআতুল ঊলুমিল ইসলামিয়া বিন্নূরী টাউনে আমরা এক সাথে দাওরা পড়েছি। তাই তিনি আমার যুগপৎ সিনিয়র এবং সহপাঠী সাথীও।

তাকে নিয়ে আমার হৃদয়ে ছিল অনেক আশা আকাংক্ষা। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, সময় সংযমী। পাঠ্য কিতাব তো বটেই আনুসাঙ্গিক কিতাবাদি ও বৈষয়িক জ্ঞান আহরণেও তিনি ছিলেন উচ্চতর প্রতিভার অধিকারী। তার মতো ছাত্র জীবনে কমই হয়ে থাকে। তার নিমগ্নতা এবং অধ্যয়নের প্রেরণা যেমন ছাত্রদেরকে পড়াশুনায় প্রেরনা যোগাতো, তেমনি আমাকেও অনুপ্রাণিত করতো।

মুফতী আমিনী ছাত্র জীবনেই দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবতেন। ইসলামবিরোধী চক্রান্তে তার হৃদয় শিহরিয়ে উঠতো। বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছাত্র জীবনেও কঠোর ভূমিকায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন,যা ইসলাম দরদী ছাত্র শিক্ষক ও জনগণের অন্তরে শক্তি যোগাতো। আমিনী একজন সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন। ছিলেন একজন সুযোগ্য শিক্ষকও। তাঁর উপস্থাপনার মাধুর্যতা ছাত্রদেরকে মুগ্ধ করে রাখতো। তাঁর মতো শিক্ষক এবং শাইখুল হাদীস পাওয়া যাবে কোথায়!

মুফতী আমিনী কেবল একজন অসাধারণ শিক্ষক, শাইখুল হাদীস ও মুহতামিমই ছিলেন না, পাশাপাশি তিনি ছিলেন জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামের মূখ্য সক্রিয় মূখপাত্র। বর্তমান সময়ে তার কোনো নজির দেখা যায় না। বাতিলপন্থীরা যখনই প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো, মুফতী আমিনীর হুঙ্কারকে বাতিলের হৃদয়ে প্রকম্পন সৃষ্টি হতো।

ইসলামবিরোধী যে কোনো শক্তির মোকাবিলায় তিনি সিংহের মতো গর্জে উঠতেন। কে তার সমালোচনা করলো, কে তার সমর্থন করলো– এসব বিষয় তার কাজের ক্ষেত্রে বাধা হতো না। আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে তিনি একাই শতদলের ভাষায় কথা বলতেন।

মুফতী আমিনীর বাহ্যিক সংগঠন তেমন সামগ্রিক ছিল না, কিন্তু দেশ বিদেশের মুসলিম জনতা, শিক্ষক-ছাত্র ও ওলামা-মাশায়েখদের অন্তরে তার কর্মকাণ্ডের প্রবল প্রভাব ছিলো। জাতীয় ইদগাহ ময়দানে তাঁর জানাযার নামাযে জনতার ঐতিহাসিক ঢল এর বাস্তব প্রমাণ।

হাদীসের আলোকে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় লোকদের মহব্বত মানুষের অন্তরে ঢেলে দেন। তারই বাস্তব প্রমাণ ছিল জানাযায় ব্যাপক লোকসমাগম। আমিনী একাই একটি দল।

রাজনৈতিক ময়দানে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। আল্লাহ ব্যতীত কাউকে পরোয়া করার অভ্যাস তার ছিল না। এ বিষয়ে সকলে একমত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমরা স্বভাবগত কারণেই যথাযথভাবে উপকৃত হতে পারিনি। এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব কোথায় মিলবে!

মুফতী আমিনী প্রকৃত অর্থেই বর্তমান যুগের রাজনীতির কলাকৌশলে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি ভালোভাবেই অবগত ছিলেন স্বীয় কর্মসুচি বাস্তবায়নের পথে কারা কারা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পর-আপনের বৈচিত্রে ভরা এদেশের মানুষের স্বভাব প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি সজাগ ছিলেন।
তাই তিনি এক পর্যায়ে বি. এন. পি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদান করেন। বি. এন. পি তার দ্বারা উপকৃত হয়। দেশের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট বি এন পির দিকে গ্রো করে। এলাকার জনগন মুফতী আমিনীকে এমপি নির্বাচিত করে। কিন্তু বি এন পি তাকে যথাযথ মুল্যায়ন করেনি।

ইসলামের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করলে হয়ত বি এন পির এ অধপতন হতো না। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমুলক আচরনের কারণে বি এন পি আজ ক্ষত বিক্ষত।

ইসলামের অবমূল্যায়নের কারণে শুধু বি এন পিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এদেশের মুসলমানরাও অপূরনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। স্বয়ং মুফতী আমিনী সমালোচিত হয়েছেন। চরম ভাবে বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। জেল হাজতের গ্নানি ভোগ করে অবশেষে গৃহবন্দী অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে যে শুণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কিভাবে কার মাধ্যমে পূরন হবে? এর জন্য বোধহয় কেবল অপেক্ষাই করতে হবে।

এদেশ মুসলমানদের দেশ। এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠি ইসলামে বিশ্বাসী। যে কোন রাজনৈতিক দল বা সরকার যখনই ইসলামী চেতনার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে,তখনই ইসলামের প্রবল শক্তির প্রভাবে মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পরাজয়ের গ্নানি ভোগ করেছে। ইসলামের এই প্রবল শক্তির প্রভাবেই চরম ইসলাম বৈরী দলকেও মাথায় পট্টি ও হাতে তাসবীহ নিয়ে জনগণের দুয়ারে ভোট ভিক্ষা করতে হয়।
কিন্তু কেন যেন ওলামা মাশায়েখদের মধ্যে এই শক্তির সঠিক বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো প্লাটফর্ম গড়ে উঠে না। না উঠার একটি কারণ ছাড়া কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। আর তা হচ্ছে আদর্শের ঐক্য থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের ঐক্য নেই।

সকল ইসলামী দলের একই কর্মসূচি একই আহবান। ইসলামী সরকার ও মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ইসলাম বিরোধী তৎপরতা বন্ধ করা, দেশ ও জাতির শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ইত্যাদি। কিন্তু উদ্দেশ্য ও লক্ষ এক হওয়া সত্তে¡ও নেতৃত্বের কোন্দলে সব আশা-আকাংক্ষা ধুলিস্যাত হয়ে যাচ্ছে। অথচ এব্যাপারে কারো কোন চিন্তা ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

বিভক্ত মুসলিম দলসমুহ নিজ নিজ অবস্থান থেকে মৌলিক ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একক নেতৃত্বে কাজ করলেও অভিষ্ট লক্ষ অর্জন করা যেত, কিন্তু তারও কোন লক্ষণ পরিদৃষ্ট নয়।

অন্যান্য অনৈসলামিক দলসমুহের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও তাদের ঐক্য ও দূরদর্শী পলিসির কারণে ক্ষমতায় বসে দেশ শাসন করে, আর সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন প্রাপ্ত ইসলামী দলসমূহ কেবল নেতৃত্বের অনৈক্যের কারণে সরকার গঠনের ধারে কাছেও যেতে পারছেনা।

এটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কি হতে পারে? মুফতী আমিনীকে রাজনৈতিক ময়দানে এমন অসহায় অবস্থায় বিভিন্ন কুল রক্ষা করে এগুতে হয়েছে।

আর দেখবো না এ হুঙ্কার!
এখন আর মুফতী আমিনী নেই। ফিরে আসারও সুযোগ নেই। এ মুহুর্তে তার মত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের তিরোধানে আল্লাহর কী মহিমা লুকায়িত আছে তা কারো জানা নেই। এদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে কি না তা বুঝা মুশকিল।

হাদীসের ভাষায় আলেমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অবর্তমানে মূর্খদের রাজত্ব কায়েম হবে। আর তখন জাতির উপর নেমে আসবে মহা দুর্যোগ। আমাদের জন্য কোন্ মহা দুর্যোগ অপেক্ষা করছে,সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

ইতিমধ্যে এর আলামতও ফুটে উঠেছে। ইসলামকে বাদ দিয়ে যে এদেশের সরকার ও প্রশাসন চলতে পারেনা– এ কথা ইসলাম বিরোধী শক্তি ভালভাবে উপলব্ধি করেছে।এজন্য তারা মুনাফেকীর আশ্রয় নিয়ে তাদের পছন্দমত লোকদের মাধ্যমে নামসর্বস্ব ইসলামী জোট গঠনের কাজে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।

হয়ত আগামী নির্বাচনেই এসব নামধারী ইসলামী দলের ভাগ্য খুলে যাবে। তারা কম করে হলেও পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হবে এবং মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মত একটি গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তাদের দখলে আসলে তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এভাবে তারাই একদিন ইসলাম ও মুসলমানদের একক নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রয়াস পাবে এবং জনগণকে হক্কানী আলেমদের প্রতি সমর্থন থেকে সরিয়ে নিতে সর্বশক্তি ব্যয় করবে। এমন পলিসি সত্যিই ভয়ংকর। ইসলামের সূচনা কাল থেকেই এই অস্ত্র ব্যবহার করে কুচক্রীরা সফলকাম হয়েছে।

আমাদের দেশে ভয়ংকর কলাকৌশল হাতে নিয়ে ইসলাম বিরোধী শক্তি মাঠে নেমেছে। আমাদের সরল প্রাণ জনগণ তাদের পলিসি বুঝতে সক্ষম নয়। এমতাবস্থায় কেবল মুফতী আমিনীর কথা মনে পড়ে।

এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে এদেশের আলেম উলামাগণ কোন একটি ইস্যুতে নেতৃত্বের ঐক্য সৃষ্টি করে বাতিল শক্তির মুকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন কী?
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, হক্কানী আলেমদের এই অনৈক্য যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীন পরিধি পর্যন্ত সীমিত থাকতো, তবুও সেটা সহনীয় ছিল। কিন্তু এই অনৈক্য রাজনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ফলে কওমী উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক ভাগ সরকারের সমর্থনে অন্ধ।

আরেক ভাগ বিরোধী দলের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ এ দু’টি দলের কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে কোন কাজই করেনি।

ভাবতে অবাক লাগে যে, যারা ইসলামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ভূমিকায় অবতীর্ণ,যারা সংবিধান থেকে মহান আল্লাহর নাম মুছে ফেলে, যারা ইসলামী শিক্ষার সূতিকাগার কওমী মাদরাসা সমূহকে জঙ্গী উৎপাদনের কারখানা বলে আখ্যায়িত করে, যারা নিরীহ মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রদের অন্যায় ভাবে গ্রেফতার করে নির্যাতন করে, যারা দাড়ি টুপিধারীদেরকে রীতিমত ভৎসনা করে, যারা ধর্মহীন স্যেকুলার শিক্ষা চাপিয়ে দেয়, যারা কুরআনের স্পষ্ট আইন বাতিল করে মুসলিম পারিবারিক আইন জারি করে, যারা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আহুত হরতাল দলীয় কর্মী ও পুলিশ দিয়ে সফল করে,যারা সবসময় ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষায় নির্লজ্জভাবে দালালী করে, তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে পরস্পর বিভক্ত হয়ে মুখোমুখী অবস্থান গ্রহণ করা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?

সর্বপ্রকার সংকীর্ণ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সমস্ত উলামায়ে কেরাম যদি রাজনীতির ময়দানে স্বতন্ত্র অবস্থানে ঐক্যবদ্ধ হতেন, তাহলে কি এদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের এমন করুণ অবস্থা হতো!

এই দুঃখজনক অবস্থার অবসানে উলামায়ে কেরাম কবে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দেবেন? সংকীর্ণতার সকল বেড়াজাল ছিন্ন করে উলামায়ে কেরাম কবে ঐক্যবদ্ধ হবেন?

সেই শুভ দিনের প্রত্যাশায় এদেশের কোটি কোটি তৌহিদী জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।


লিখেছেন-
মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান সাহেব (বারাকাল্লাহু ফি হায়াতি)
প্রিন্সিপাল, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা।
সূত্র: শায়েখের ফ্যান পেজ

আল-আকসা!

আলআকসা!
মাওলানা আতিক উল্লাহ
(১) পুরো চৌহদ্দিকেই ‘আলমাসজিদুল আকসা’ বলা হয়। চৌহদ্দির মধ্যে সালাত আদায় করলেই ফযীলত অর্জন হয়ে যাবে।  
(২) সোনালি গম্বুজের দিকটা হল উত্তর। কালোমত গম্বুজের দিকটা হল দক্ষিণল। সোনালি গম্বুজকে কুব্বাতুস সাখরা বলে। এখানেই একটা পাথরখণ্ড আছে। সেদিকে ফিরেই ইহুদিরা সালাত আদায় করত। মুসলমানরাও মদীনায় এসে প্রথম ১৬মাস সাখরার দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছে।
(৩) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমার সালাত হয় মূলত দক্ষিণে দিকস্থ মসজিদে কিবালিতে।

(১) আলমাসজিদুল আকসা মানে, চার দেয়ালের ভেতরের অংশ ও চৌহদ্দির বাইরে দক্ষিণ দিকের কিছু অংশ। পুরোটা মিলেই ‘হারাম’ বা পবিত্র এলাকা। এই চৌহদ্দীর যে কোনও স্থানে সালাত আদায় করলেই ‘আলআকাসায়’ সালাতের ফযীলত মিলবে। এর আয়তন ১৪৪০০০ বর্গমিটার। 

(২) আলমাসজিদুল আকসা মানে শুধু ‘আলজামেউল কিবালি’ বা শুধু ‘কুব্বাতুস সাখরা’ নয়। পুরো কমপ্লেক্সটাকেই আলমাসজিদুল আকসা বলা হয়।

(৩) চার দেয়ালের অভ্যন্তরে, পুরো কমপ্লেক্সে অনেক স্থাপনা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হল দু’টি।

(ক). আলজামেউল কিবালি। দক্ষিণ দিকের পুরনো মসজিদটা। এটাই মূল মসজিদে আকসা। উমার রা. এটাকে নির্মাণ করেছিলেন। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে। পৃথিবীর প্রথম মসজিদ মক্কার বায়তুল্লাহ। তার চল্লিশ বছর পর নির্মিত হয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস। 
(খ). কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দি রক। সোনালি গম্বুজওয়ালা মসজিদটা। কমপ্লেক্সের উত্তর দিকের প্রায় মাঝামাঝিতে অবস্থিত। গম্বুজটা খেলাফতে রাশেদার যুগে ছিল না। মুয়াবিয়া রা. ইয়াযিদ, মারওয়ানের যুগেও ছিল না। এটা নির্মিত হয়েছে পঞ্চম উমাইয়া খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান (৬৮৫-৭০৫)-এর শাসনামলে। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে।

(৪). সাখরা (الصخرة) অর্থ পাথরখণ্ড বা ‘রক’। কুব্বাতুন (قبة) অর্থ গম্বুজ বা ‘ডোম’। পুরো কমপ্লেক্সের মধ্যে, এই পাথরখণ্ডটা ছিল উঁচু ভূমিতে। এই পাথরখণ্ডটাই ছিল পূর্বেকার নবীগনের কিবলার কেন্দ্রবিন্দুতে। অর্থাৎ এই পাথরখণ্ডকে কিবলার মূলবিন্দু ধরে সবাই সালাত আদায় করত। মদীনায় আসার পর, মুসলমানরা এই ‘সাখরার’ দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিল প্রায় ষোল মাস। 
ইহুদিরাও এই পাথরখণ্ডকে মূল কেন্দ্রবিন্দু ধরে তাদের উপাসনা করত। কিছু খ্রিস্টান উপদলও এটাকে কিবলা মানত। উমার রা. বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করার পর দেখলেন, পাথরখণ্ডটা ময়লা-অবর্জনার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। খ্রিস্টানরা পরিকল্পিতভাবেই ‘সাখরার’ উপর তাদের সমস্ত ময়লা-নোংরা ফেলত। তারা এটা করত ইহুদেরকে অপমান করার জন্যে। উমার রা. দেখামাত্র ময়লা সরানোর নির্দেশ দেন। নিজেও ময়লা সরানোর কাজে লেগে পড়েন। 

(৫). সাখরার আশপাশ পরিষ্কার করার পর, উমার রা. একটা মসজিদ নির্মাণ করার প্রস্তুতি নিলেন। মসজিদটা কোথায় কিভাবে নির্মাণ করবেন, সে ব্যপারে পরামর্শ করলেন। একপর্যায়ে কথা বললেন, কা‘বে আহবারের সাথে। তিনি একজরন তাবেয়ী। ইহুদি থেকে মুসলমান হয়েছেন। মুসলমান হওয়ার আগে তিনি একজন ইহুদি প-তি ছিলেন। এজন্য তাকে ‘আহবার’ বলা হয়। উমার রা.-এর প্রশ্নের উত্তরে কা‘ব বললেন,
মসজিদটা সাখরার পেছনে মানে পূর্বপাশে নির্মাণ করতে পারেন। 
উমার রা. তার কথা শুনে বললেন,
يا ابن اليهودية! خالطتك اليهودية ، بل أبنيه أمامها فإنّ لنا صدورَ المساجد ، 
“হে ইহুদি মায়ের বেটা, তোমার মধ্যে এখনো ইহুদিবাদ মিশে আছে। আমি বরং মসজিদটা সাখরার সামনে নির্মাণ করব।”

(৬). কা‘বের কথামত সাখরার পেছনে মানে পূর্বপাশে মসজিদটা নির্মাণ করলে, সাখরা থাকবে সমজিদের সামনে। মানে মুসলমানরা যদিও ‘কা‘বার’ দিকেই মুখ করে দাঁড়াবে, কিন্তু পাশাপাশি আগের কিবলা ও ইহুদিদের কিবলা ‘সাখরা’ও মুসলমানদের সামনে পড়ে যাবে। এটা একপ্রকার ইহুদিদের কিবলার অনুসরণ হয়ে যাবে। দূরদর্শী উমার রা. চট করেই ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, তোমার মধ্যে এখনো আগের ইহুদিবাদের গন্ধ রয়ে গেছে। পুরনো কিবলার প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে।


(৭). সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনগনের কেউ সাখরার কাছে সালাত আদায় করেননি। এখানে কোনও স্থাপনাও ছিল না। সাখরা একসময় মুসলমানদের কিবলা ছিল। পরে মানুসুখ বা রহিত হয়ে গেছে। এখন মুসলমানদের কাছে সাখরার বাড়তি কোনও মূল্য নেই। সালাফের কেউ আলআকসায় গেলে, মসজিদে কিবালি মানে উমার রা. কর্তৃক নির্মিত মসজিদে। সালাফের কাছে সাখরা কোনও গুরুত্ব পেত না। 
(মাজমুয়া রাসায়েলে ইবনে তাইমিয়া রাহ.)

(৮). ইহুদিদের কাছেও এই কমপ্লেক্সটা গুরুত্বপূর্ণ। দু’টি কারণে,
ক. কারণ তাদের প্রাচীন কিবলা এই কমপ্লেক্সের ভেতরে। ডোম অব দি রক বা কুব্বাতুস সাখরার নিচে। পাশাপাশি মুসলমানরাও মনে করে, এই সাখরা থেকেই নবীজি সা. মেরাজের রাতে উর্দ্ধাকাশে আরোহণ করেছিলেন। যদিও এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু এটাই মুসলিম ঐতিহাসিকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। 
খ. সাখরার নিচে একটা গুহা আছে। সেখানে সালাত আদায় করার মতো একটা মেহরাব আছে। সেটাকে বলা হয় (مُصلى الأنبياء) নবীগনের সালাতের স্থান। 
গ. হায়েতুল বুরাক। এখানে নবীজি সা. মেরাজের রাতে তার বোরাক বেঁধেছিলেন। ইহুদিরা এই দেয়ালকে বলে, ওয়েলিং ওয়াল বা ওয়েস্টার্ণ ওয়াল। এটার অবস্থান, কুব্বাতুস সাখরা ও মসজিদে কিবালির মাঝামাঝিতে। পশ্চিম দিকস্থ সীমানা প্রাচীর। ইহুদিরা মনে করে, এই প্রাচীর সুলাইমান আ. যে মসজিদ বা হায়কাল নির্মাণ করেছিলেন, তার অবশিষ্টাংশ।


(৯) পুরো কমপ্লেক্সের দিকটাও ঠিক করে নেয়া জরুরী। কমপ্লেক্সটাকে লম্বালম্বিভাবে আমরা উত্তরী-দক্ষিণী ধরে নিতে পারি। এই হিশেবে, কুব্বাতুস সাখরা আছে কমপ্লেক্সের উত্তর দিকের মাঝামাঝিতে। জামে কিবালি বা পুরনো গম্বুজের মসজিদটি আছে কমপ্লেক্সের দক্ষিণ দিক ঘেঁষে।

দৃষ্টি আকর্ষণ:
১: তথ্যগত কোনও বিভ্রাট থাকলে ধরিয়ে দেয়ার বিনীত অনুরোধ থাকল। 
২: আরও কোনও তথ্য যোগ করার প্রয়োজন বোধ করলে, জানানোর অনুরোধ থাকল। একটা পোস্টে যেন সবার খটকাগুলো দূর করার মতো উপকরণ জমা হয়ে থাকে। 
৩: ছবিগুলো সম্পর্কে আলাদা করে বিবরণ আস্তে আস্তে যোগ করে দেব ইনশাআল্লাহ।

Monday, November 27, 2017

এখন যা প্রয়োজন!


এখন যা প্রয়োজন!
(মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ আদীব হুজুর হাফিযাহুল্লাহ)
এখন প্রয়োজন চোখের পানি নয়, এখন প্রয়োজন জিহাদের আগুন। কলমের কালি নয়, এখন প্রয়োজন বুকের তাজা খুন এবং দুর্বলের ফরিয়াদ নয়, এখন প্রয়োজন বজ্রের গর্জন।

কিন্তু আমার মত কমযোর-বুযদিল চোখের পানি ও কলমের কালি ছাড়া আর কী ঝরাতে পারে! 
আমার বুকে তো নেই ঈমানের কুওয়াত, আমার দিলে তো নেই মুজাহিদের হিম্মত, আমার শিরায় তো নেই রক্তের সেই উচ্ছ্বাস! আমি শুধু কাঁদতে পারি আর লিখতে পারি। তাই ভেবেছিলাম, আজ এই নিঃসঙ্গ রাতে শুধু নিজেকে সান্ত্বনা দিতে অশ্রুর কালিতে আমি কিছু লিখবো।

আমি লিখবো আফগানিস্তানের নিঃসঙ্গ মুজাহিদের কথা,রক্তের সফরে যাদের সঙ্গী হলো না মুসলিম বিশ্বের কোন দেশ ও দেশ-নেতা।  তবু তারা শরীরের জখম এবং হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে অবিচল রয়েছে জিহাদের পথে। অস্ত্র নেই, আশ্রয় নেই, অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, দুনিয়ার কোন উপায়-উপকরণ নেই। তবুও তারা পড়ে আছে পাহাড়ে-পর্বতে, গুহায়-গহবরে শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করে।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো ফিলিস্তিনের মজলুম মুসলমানদের কথা, যাদের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু এবং শহর ও জনপদ ধ্বংস হয়ে গেছে ইহুদী হায়েনাদের হাতে। পঞ্চাশ বছর ধরে যারা দেশছাড়া বাস্তুহারা, যাদের বাঁচার কোন উপায় নেই আত্মঘাতী হামলা ছাড়া, কিন্তু মানবতার মোড়লদের চোখে তারা হলো সন্ত্রাসী, আর ইহুদী হায়েনা হলো শান্তিবাদী।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো গুজরাটের অসহায় বনী আদমের কথা, মুসলিম পরিচয়ের অপরাধে হিন্দু নরপশুদের হাতে যারা আজ ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম নিধনযজ্ঞের শিকার, অথচ মুসলিম বিশ্ব নির্বিকার! এটা নাকি ভারতের ভিতরের ব্যাপার! আর যারা মানবতার দাবিদার, কোথায় তাদের সভ্যতা? কোথায় তাদের মানবতা ও মানবাধিকার?

যেখানে জীবন্ত মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়, নিষ্পাপ শিশুকে ত্রিশূলে গেঁথে হত্যা করা হয়, যেখানে আমার মা-বোনকে...
নাহ, আর পারছি না, আর সহ্য হয় না।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো আরকানের মুসলিমদের কথা, যারা ঐ নেড়া বোদ্ধৃদের হাতে জান, মাল, ইজ্জত-আবরু হারিয়েছে এবং যাদের শহর ও জনপদ সব শেষ হয়ে গেছে নেড়া বৌদ্ধদের হাতে। যুগ যুগ ধরে তারা দেশছাড়া বস্তুহারা, মানবাধিকার আজ অন্ধ, উলটো জঙ্গী তাকমা দিয়ে তারা এখন সন্ত্রাসী আর বৌদ্ধরা ধুয়া তুলসী পাতা।

ভেবেছিলাম আজ এই নিঃসঙ্গ রাতে শুধু নিজেকে সান্ত্বনা দিতে অশ্রুর কালিতে আমি লিখবো তাদের কথা যাদের সাথে আমার বন্ধন ঈমানের এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের, যাদের সাথে আমার সম্পর্ক একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গের। কিন্তু আমার চোখে আজ কান্না এলো না, আমার কলমে স্পন্দন জাগলো না। তাহলে? তাহলে কি ঈমানের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে গেলো আমার হৃদয় থেকে?

এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলার, এক ফোঁটা কালি ঝরাবার এবং একটু আর্তনাদ করার যোগ্যতাও কি হারিয়ে গেলো আমার?

হঠাৎ মনে হলো, আমার মাঝে এক নতুন সত্তা জেগে উঠলো এবং চাবুকের আঘাত আমাকে জাগিয়ে তুললো। এতদিন আমি চোখের পানিতে এবং কলমের কালিতে শান্তনা খুঁজেছিলাম,তাই নিজেকে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ নিজের মাঝে আমি যেন সত্যিকার আমাকে খুঁজে পেলাম। 

দিল থেকে আমার কমযোরি ও বুযদিলি এবং ভীরুতা ও অক্ষমতার অনুভূতি মুছে গেলো। আমার সমগ্র সত্তায় ঈমানের বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি হলো এবং শিরায়-উপশিরায় সেই রক্ত টগবগ করে উঠলো যা একদিন ঝরেছিলো বদরে, উহুদে ইয়ারমুকে কাদেসিয়ায় এবং যুগে যুগে ইতিহাসের লালপাতায়।

আমার আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমি শপথ নিলাম, শুধু চোখের পানি নয়, শুধু কলমের কালি নয়, আল্লাহর রাস্তায় এবার ঝরবে আমার বুকের রক্তও। হে আল্লাহ! আমাকে আমি তোমার হাতে সঁপে দিলাম, যেভাবে তোমার পছন্দ আমার চোখের পানি, আমার কলমের কালি এবং আমার বুকের রক্ত তোমার দ্বীনের জন্য এবং তোমার পেয়ারা হাবীবের জন্য ব্যবহার করো।

আমি শুধু দেখতে চাই, দুনিয়াতে তোমার দ্বীন আবার যিন্দা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ তার হারানো গৌরব আবার ফিরে পেয়েছে। ইসলামের হিলালী ঝাণ্ডা আবার সগৌরবে উড্ডীন হয়েছে। তাহলে আমি ভুলে যাবো বসনিয়া ও চেচনিয়ার বিভীষিকা। ভুলে যাবো ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের ভয়াবহতা। ভুলে যাবো এমনকি গুজরাটে আমার মুসলমান ভাইদের নিধনযজ্ঞের ও আরাকানি ভাই বোনদের বীভৎসতা।
(সূত্রঃ- আল-কলম/ ৩য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, রবিউল আউয়াল, ১৪২৩ হিঃ/ পুষ্প সমগ্র/ পৃঃ ৪১৪)

Friday, November 24, 2017

কাউকে অবজ্ঞা ও উপহাস করার পরিণতি!



মুফতী মুহাম্মদ তক্বী উসমান দা.বা.
অনুবাদঃ মুফতী মাহমুদ হাসান
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ [٤٩:١١]

মুমিনগণ,কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম। (সূরা হুজরাত, আয়াত-১১)

উক্ত আয়াতে “তাসখীর”-এর অর্থ হলো, কারো অসম্মান ও তাচ্ছিল্য করা। এমনভাবে কারো দোষ বর্ণনা করা,যাতে মানুষ তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে,এতে ওই ব্যক্তির অন্তরে ব্যথা আসে। এ ধরনের কাজ অনেক রকম হতে পারে।

যেমন,কারো চলাফেরা,উঠাবসা,কথাবর্তা,অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি নিয়ে ব্যঙ্গ করা,কারো শারীরিক গঠন ও আকার-আকৃতি নিয়ে কটূক্তি করা তার কোনো কথা বা কাজের ওপর ঠাট্টা করা। চোখ, হাত-পা দ্বারা টিকা-টিপ্পনী মারা ইত্যাদি এ সকল জিনিস অন্তর্ভুক্ত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,“দুনিয়ায় যারা কাউকে নিয়ে উপহাস করে তাদের জন্য আখিরাতে জান্নাতের দরজা খোলা হবে এবং তাদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকা হবে। কিন্তু তারা যখন কাছে এসে জান্নাতের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে উদ্যত হবে তখনই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এভাবে বারবার তাদেরকে ডাকা হবে এবং প্রবেশ করতে গেলেই তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। একপর্যায়ে এভাবে করতে করতে সে নিরাশ হয়ে আর জান্নাতের দিকে ফিরে যাবে না। এভাবে দুনিয়ায় তার উপহাসের পরিণামে আখিরাতে তাকে নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা হবে।

অনর্থক কথায় ইহকাল ও পরকালীন ক্ষতি:
কিছু লোক ঠাট্টা ও উপহাসকে হাস্য-রহস্যের অন্তর্ভুক্ত মনে করে কাউকে উপহাস করে বসে,অথচ উভয়ের মাঝে বিস্তর ব্যবধান।

রসিকতা শর্ত সাপেক্ষে বৈধ,যা নবী করীম (সা.) থেকেও প্রমাণিত।
শর্ত হলো, এতে যেন অসত্যের মিশ্রণ না হয় এবং কারো মনে কষ্টের কারণ না হয়। তাও সর্বদা ও অভ্যাসগত যেন না হয়,বরং কখনো কখনো হয়ে যাওয়া মন্দ নয়।

কিন্তু যে উপহাস ও ঠাট্টার কারণে কারো মনে ব্যথা আসে তা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। এ ধরনের উপহাসকেও বৈধ রসিকতার অন্তর্ভুক্ত মনে করা মূর্খতা এবং গোনাহের কারণ।

কারো উপহাস করা মুখের গোনাহের মধ্য থেকে একটি বড় গোনাহ। আমি গত মজলিসে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এ কথা বলে ছিলাম যে অনর্থক কথা, অর্থাৎ এমন কথা বলা,যা দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণকর নয় তা মানুষকে কোনো না কোনো গোনাহে নিপতিত করার উসিলা হয়ে থাকে,তা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। তা শুনে কোনো কোনো সাথী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে কখনো কখনো আমরা ঘরে বিবি-বাচ্চা ও মেহমানদের সাথে বিভিন্ন কথা বলে থাকি,ওই সময় কথা না বলে একদম চুপ করে থাকাটা মেহমানের হক্ব পরিপন্থী ও অসম্মান বোঝায় তখন কী করা উচিত?
তো ভালো করে বুঝে নেওয়া উচিত যে অনর্থক কথা বলা এক জিনিস,যাতে দ্বীন-দুনিয়া কোনোটিরই উপকার নেই এবং এর সাথে কারো হক্বও সম্পৃক্ত নয়।

অথচ আমাদের ওপর আমাদের বিবি-বাচ্চাদের হক্ব রয়েছে, তা আদায় করাও জরুরি। ইরশাদ হয়েছে, “তোমার ওপর তোমার নফসেরও একটি হক্ব রয়েছে এবং তোমার স্ত্রীরও হক্ব রয়েছে।” এখন যদি কোনো মানুষ অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে বিবি-বাচ্চাদের সাথেও কথা না বলে,তাহলে তাদের হক্ব নষ্ট হবে,তা কখনো জায়েয হবে না।

অনুরূপ মেহমানের সাথে চুপ করে বসে থাকা ওই মেহমানের অধিকার হরণ হকে । মেহমানের সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করা এবং তাকে খুশি করাও সাওয়াবের কাজ। আর তা একজন মুসলমানের প্রাপ্য। মেহমানের সম্মান করতে হবে। এর জন্য তার মন রক্ষার্থে তার সাথে কথাবার্তা বলতে হবে।
তবে হ্যাঁ,এসব কিছুরও একটি সীমা রয়েছে,সীমাতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়।

মেহমানের হক্ব আদায়ের সীমা:
এ কথার ওপর আমার একটি ঘটনা স্মরণ হয়েছে। তা হলো অধিকাংশ সময় কিতাবাদি মোতালাআয় ব্যস্ত থাকি,বিশেষত যখন লাইব্রেরিতে মোতালাআর জন্য বসি,গবেষণার কাজে নিমগ্ন হই,কোনো বিষয় অন্তরে এলে কলম নিয়ে তা লিখতে উদ্যত হই;ঠিক তখনই কখনো কোনো মেহমান এসে পড়ে। সে সালাম-মুসাফাহা করে কথায় লেগে যায়। তখন এতে অন্তরে একটু বিরক্তির উদ্রেক হয় এবং বোঝা মনে হয়।

এ ব্যাপারে আমাদের হযরত শায়েখকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন,ভাই! তুমি যে লেখালেখি ও পড়াশোনা করছ তা কি তোমার নফসের চাহিদা পূরণের জন্য করছ নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছ। যদি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যই এগুলো করে থাকো তাহলে এ মুহূর্তে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি হচ্ছে মেহমানের সম্মান ও আপ্যায়ন করা। এটিই এ মুহূর্তের হক্ব ও অধিকার।

যদিও তুমি আজকের দিনে এই কাজ সম্পাদনের শিডিউল করেছ,তবে যেহেতু এখন মেহমান এসে গেছে,কাজের ফাঁকে মেহমানকেও একটু সময় দেওয়া তার হক্ব এবং আল্লাহর হুকুম। সালাম-কালাম ও সংক্ষিপ্ত কথাই হোক। মেহমানকে ওই সময় পর্যাপ্ত সময় না দিতে পারলেও সংক্ষিপ্ত কথার পর পরবর্তীতে অন্য সময় দিতে পারো।

আর যদি তোমার পড়াশোনা-লেখালেখির কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়,বরং তোমার নফসের চাহিদা পূরণার্থে হয় এবং মেহমানকে সময় দিতে কষ্ট হয়,তাহলে তা নফসের গোলামী হবে। এটি কোনো শরীয়ত নয়। যে সময় আল্লাহর যে হুকুম সে সময় তা করার নামই হলো শরীয়ত।
হযরতের এ কথার দ্বারা আমার এ ব্যাপারে সকল সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। অর্থাৎ মেহমানের সাথে প্রয়োজন অনুপাতে সালাক কালাম ও আলাপ-আলোচনার দ্বারা সময় নষ্ট হয় না,বরং তা মেহমানের হক্বের অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ ও সন্তুষ্টির কারণ।

তবে হ্যাঁ,মেহমানকেও আপনার সময় এবং কাজের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। অযথা যেন মেজবানের সময় নষ্ট না করে। অতিরিক্ত ও অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়।

কারো উপহাস করা উচিত নয়:
প্রয়োজনাতিরিক্ত কথাও অনর্থক কথার অন্তুর্ভুক্ত। সাধারণ কথা থেকে টেনে শয়তান গোনাহের দিকে কখন যে নিয়ে যাবে তা টেরও পাওয়া যাবে না। আমাদের মধ্যে কিছু মানুষ রয়েছে সিধেসাদা ও সরল প্রকৃতির। তাদেরকে নিয়ে কিছু মানুষ হাসি-তামাশা করে থাকে,সেই যেন একটা কৌতুকের বিষয় বস্তু। সে কৌতুক যদি এই পরিমাণে সীমাবদ্ধ হয় যাতে সে খুশি থাকে তাহলে তো আপত্তিকর নয়।

তবে যদি কৌতুক ও ঠাট্টা এ পর্যায়ে পৌঁছে যায়,যা তার অন্তরে কষ্ট দেয়,তার খারাপ লাগে,তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত কৌতুক ও রহস্য অনেক বড় গোনাহের কারণ হবে।

কেননা তা বান্দার হক্বের সাথে সম্পৃক্ত। আর যে আয়াতটি আমি শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম। সূরা হুজুরাতের আয়াত, যাতে আল্লাহ তাআলা মুআশারাতের দিকনির্দেশনামূলক বেশ কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ করেন
لا يسخر قوم من قوم
“কেউ যেন কারো উপহাস না করে।”
عسى ان يكونوا خيرا منهم
“হতে পারে যাদেরকে উপহাস ও তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে তারা (আল্লাহর নিকট) তোমাদের থেকে উত্তম।”
এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, ولا نساء من نساء “অনুরূপ কোনো মহিলা অপর মহিলাকে তাচ্ছিল্য করবে না।” عسى ان يكن خيرا منهن “হতে পারে তাচ্ছিল্যকৃত মহিলা তোমাদের চেয়ে আল্লাহর নিকট উত্তম।”

কোরআনে কারীমের এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা সুস্পষ্টভাবে কাউকে নিয়ে উপহাস করতে শক্তভাবে নিষেধ করেছেন।

এই আয়াতে মহিলাদেরকে বিশেষভাবে দ্বিতীয়বার উল্লেখ করা হয়েছে,যদিও আয়াতের প্রথম অংশের দ্বারাই মহিলা-পুরুষ সকলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। তার পরও মহিলাদের ব্যাপারটা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ আল্লাহ তা’আলাই বেশি জানেন।
তবে এর দুটি হিকমত বোঝা যায়।

এক.
সাধারণত মহিলাদের মধ্যে এ অভ্যাসটি বেশি পরিলক্ষিত হয়,তাই তাদেরকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

দুই.
যেহেতু পুরুষদের মজলিস ভিন্ন হবে এবং মহিলাদের মজলিস ভিন্ন হবে,তাই পৃথক পৃথক উল্লেখ করে বোঝানো হয়েছে যে পুরুষ-মহিলার মজলিস ও চলাফেরা ভিন্ন ভিন্ন হওয়া উচিত। আজকাল যেরূপ নারী-পুরুষের যে অবাধ মেলামেশা এ আয়াতে ইঙ্গিতে তা নিষেধ করা হয়েছে।

কাউকে ঠাট্টা ও উপহাস করা কবীরা গোনাহ:
যা হোক! উক্ত আয়াতে কাউকে উপহাস করাকে সুস্পষ্ট গোনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিশেষভাবে এ কথাও বোঝানো হয়েছে যে তোমরা অন্যকে যে তাচ্ছিল্য করছ এর দ্বারা তোমরা নিজেকে বড় ও উত্তম ভেবেই অপরকে তাচ্ছিল্য করছ। এ তো চরম অহংকার যে নিজেকে উত্তম ভেবে অপরকে তুচ্ছ ভাবা হচ্ছে।

তবে স্মরণ রেখো,আল্লাহ তা’আলা বলছেন,“ওই সহজ-সরল সিধেসাদা যে ব্যক্তিকে তুমি তাচ্ছিল্য করছ,সে আল্লাহ তা’আলার নিকট কতটুকু মর্যাদাশীল। কারো শুধু চেহারা দেখেই তো তুমি বলতে পারবে না যে আল্লাহ তা’আলার সাথে তার কতটুকু সম্পর্ক।

প্রত্যেক বান্দার সঙ্গেই আল্লাহ তা’আলার বিশেষ একটি সম্পর্ক থাকে,এর মাঝে অনুপ্রবেশ করার কি অধিকার তোমার? তুমি কি জানো,সে আল্লাহর সাথে কী সম্পর্ক গড়ে নিয়েছে, সে আল্লাহর কত প্রিয়? কারো শুধু বাহ্যিক অবয়ব দেখেই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। কেননা মানুষ জানে না কার সাথে আল্লাহর সাথে আন্তরিকভাবে কতটুকু গভীর সম্পর্ক।

কাউকে জাহান্নামী বলা জায়েয নেই:
কতেক লোক কারো ব্যাপারে বলে দেয় যে সে তো জাহান্নামী,তার অমুক দোষ ইত্যাদি। নাউযুবিল্লাহ! কথাটি অনেক মারাত্মক কথা। জান্নাত-জাহান্নামের ফয়সালা আল্লাহ তা’আলার হাতে। কাউকে এ ধরনের কথা বলা উচিত নয়।

আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন। বাহ্যিক কাউকে খারাপ,বদকার,ফাসেক মনে হলেও হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.)-এর পরামর্শ হলো,তার ব্যাপারে এই চিন্তা করবে যে হতে পারে আল্লাহ তা’আলা তার ভেতর এমন কোনো ভালো গুণ রেখেছেন,যার বদৌলতে তার সাথে আল্লাহর সাথে এমন মজবুত সম্পর্ক হয় যার উসিলায় তোমার চেয়ে মর্যাদায় আগে বেড়ে যাবে। আজ যদিও মন্দ মনে হচ্ছে,কাল হয়তো আল্লাহর রহমতে এমন পরিবর্তন হবে যে সবাইকে পেছনে ফেলে দেবে।

কাউকে দেখে নিজেকে বড় মনে করা,তার থেকে নিজেকে উত্তম মনে করা এবং ওই ব্যক্তিকে ছোট মনে করাকেই তাকাব্বুর বা অহংকার বলা হয়। অহংকার মারাত্মক ক্ষতিকর একটি জিনিস।
আল্লাহ তা’আলা দয়া করে সকল মুমিনকে তা থেকে হেফাজত করুন।

গোনাহগারকে তাচ্ছিল্য করাও হারাম:
এ জন্য আল্লাহ তা’আলার উক্ত ইরশাদ ব্যাপকভাবে সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য –
عسى ان يكون خيرا منهم
“হতে পারে ওই সব লোক তাদের থেকে উত্তম।” বাক্যটি ব্যাপক,মুত্তাকী পরহেযগার, গোনাহগার সকলেই অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ- يا يسخر قوم من قوم বাক্যটিও ব্যাপক অর্থবোধক।

কেউ কারো উপহাস যেন না করে চাই উপহাসকারী যত বড় মুত্তাকী-পরহেযগারই হোক এবং উপহাসকৃত ব্যক্তি যত বড় ফাসেক ও গোনাহগারই হোক না কেন।

হ্যাঁ,এটা জায়েয আছে যে অমুক ব্যক্তির এ কাজটি গোনাহের কাজ এবং তা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে। কিন্তু গোনাহের কারণে গোনাহগার ব্যক্তিকে তাচ্ছিল্য ও অপমান করা বৈধ নয়।
কথাটি এভাবে বুঝতে পারো গোনাহগারকে মূলত অসুস্থ মনে করো। কেউ যদি কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে তার ওপর দয়ার আচরণ করা হয়। তার সাথে রাগ করা যাবে না,তাচ্ছিল্য ও অপমান করা যাবে না।

তো গোনাহগার বেচারাও একজন গোনাহের রোগী। কে বলতে পারে,হয়তো আল্লাহর নিকট তার কোনো কাজ পছন্দনীয় হয়ে আছে,যার বদৌলতে তাকে মর্যাদাবান করে দেবেন।

এ জন্য কখনো কাউকে তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা যাবে না। তুমি বাহ্যিকভাবে যত বড় মুত্তাকী-পরহেযগারই হও, কিন্তু হতে পারে তোমার চেয়ে ওই উপহাসকৃত ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অনেক মর্যাদাবান।

ইঙ্গিতেও কাউকে উপহাস করা বৈধ নয়:
কাউকে ইশারা-ইঙ্গিতে উপহাস করাও এর অন্তর্ভুক্ত। কারো কথাবার্তা,চালচলন বা গঠন-প্রকৃতি নিয়ে টিকা-টিপ্পনী মারা ও হাসাহাসি করা,যার কারণে সে কষ্ট পায়,তাও হারাম।

এক হাদীসে এসেছে,একদা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জনৈকা স্ত্রীর ব্যাপারে আলোচনা প্রসঙ্গে ঈঙ্গিতে তাঁর গঠন বেঁটে হওয়ার কথা বললেন,শুধুমাত্র হাতের ইশারায় তা বলেছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন,আয়েশা! তুমি মারাত্মক ভুল করেছ। হযরত আয়েশা (রা.)-কে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন যেন কখনো কারো কোনো বিষয় নিয়ে তাচ্ছিল্য না করা হয়। যেরূপ সামনাসামনি কারো কোনো বিষয় নিয়ে এমন কথা বলা,যাতে ওই লোক কষ্ট পায়,তা তো মারাত্মক গোনাহ। সাথে সাথে উক্ত ঠাট্টা ও উপহাস যদি তার সামনে না করে তার অনুপস্থিতিতে করা হয় তাহলে তাতে দ্বিগুণ গোনাহ। উপহাস করার গোনাহ এবং গীবত করার গোনাহ।

হাসি-রহস্য ও উপহাসের মাঝে বিস্তর পার্থক্য:
কখনো কখনো বন্ধুদের মজলিসে পরস্পর হাসি-মশকরা হয়ে থাকে,যাতে এ কথা নিশ্চিত হয় যে এর দ্বারা কোনো সাথী মনে কষ্ট পায় না এবং ওই সব কথায় কেউ অপমান বোধ না করা নিশ্চিত হয় তাহলে তা বৈধ।

কিন্তু যদি এই সম্ভাবনা থাকে যে এর দ্বারা কারো মনে কষ্ট আসতে পারে কিংবা কেউ অপমান বোধ করবে তাহলে এ ধরনের হাসি-তামাশা কখনো বৈধ হবে না।

কারো উপহাস করার ভয়ংকর পরিণতি:
একটি হাদীসে এসেছে,যারা অন্য কারো উপহাস করে,তারা তো এই উপহাস করে বসেই থাকে,কিন্তু তাদের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। আখিরাতে তাদের সাথেও এ ধরনের উপহাস করা হবে। জান্নাতের দরজা খুলে তাদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকা হবে,কিন্তু তারা যখন এগিয়ে এসে দরজা দিয়ে ঢুকতে যাবে,অমনিই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তারা ফিরে যাবে। এরপর পুণরায় দরজা খুলে তাদেরকে ডাকা হবে,আবার যেইমাত্র তারা এগিয়ে এসে ঢুকতে যাবে তখনই দরজা পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হবে। এভাবেই তার সাথে বারবার উপহাস করতে থাকবে। একপর্যায়ে সে নিরাশ হয়ে আর জান্নাতের দিকে যাবে না। এই শাস্তি এই জন্যই যে তুমি দুনিয়ায় তোমার কথাবার্তায় কাউকে উপহাস করে কষ্ট দিয়েছিলে এখন দেখো এর মজা কী রূপ।

এ জন্যই সাবধান হওয়া উচিত,যেকোনো কথা বলার আগে মেপেজুখেচিন্তাভাবনা করেই তবে বলতে হবে।

রহস্য ও কৌতুকের সীমারেখা:
কেউ কেউ মানুষের উপহাস করাকে সাধারণ রহস্য ও কৌতুকের অন্তর্ভুক্ত মনে করে থাকে। অথচ উভয়ের মাঝে বিস্তর ব্যবধান।

হাসি-রহস্য হচ্ছে ওই সব কথাবার্তা,যার দ্বারা সকলের মনে প্রফুল্লতা আসে।
হযরত রাসূলে করীম (সা.) থেকেও তা প্রমাণিত। তবে শর্ত হলো, এ ক্ষেত্রে কোনো মিথ্যা ও অসারতার আশ্রয় নেওয়া যাবে না,কাউকে অপমান করা যাবে না। তাহলে তা বৈধ।
একটি হাদীসে এসেছে,জনৈকা বৃদ্ধা মহিলাকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। এতদশ্রবণে বৃদ্ধা মহিলা কান্না আরম্ভ করল। তখন রাসূল (সা.) সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,আসল কথা হলো বৃদ্ধ অবস্থায় কেউই জান্নাতে যাবে না। অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশের সময় আল্লাহ তা’আলা সকলকে যৌবন অবস্থা ফিরিয়ে দেবেন।

তো রাসূল (সা.) ওই বৃদ্ধার সাথে রহস্য করতে গিয়ে কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলেছেন,যা বৃদ্ধা বুঝতে পারেনি। তবে রাসূল (সা.)-এর কথায় অসত্যের মিশ্রণ হয়নি এবং ওই বৃদ্ধার মনে কষ্ট বা সম্ভ্রমহানিও হয়নি।

অনুরূপ একটি হাদীসে এসেছে,জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, তোমাকে আমি একটি উটের বাচ্চা দেব তখন লোকটি বলল,হুজুর! আমি তো বাহনের উট চেয়েছি,বাচ্চা দিয়ে কী কাজ হবে? রাসূল (সা.) বললেন,বাহনের উপযুক্ত বড় উটটিও তো কোনো একটি উটনীর বাচ্চা হবে।
সামান্য সময়ের জন্য রাসূল (সা.) লোকটির সাথে রহস্য করলেন। কিন্তু এতে কোনো অসত্যের আশ্রয় নেওয়া হয়নি এবং কাউকে কষ্টও দেওয়া হয়নি। এসব অবশ্যই বৈধ।

তবে এমন বৈধ কৌতুকও মাঝেমধ্যে হয়ে গেলে মন্দ নয়,কিন্তু নিয়মিত এতে লিপ্ত হয়ে যাওয়াও কাম্য নয়। মাঝেমধ্যে হলে ভালো।
তবে অবশ্যই ধর্তব্য যে এসব কৌতুক রহস্যের মধ্য দিয়ে কোনো মিথ্যার প্রচার যেন না হয়,কারো প্রতি দোষারোপ বা গীবত না হয়। সর্বোপরি কেউ যেন কষ্ট না পায়। অন্যথায় তা মারাত্মক গোনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সারকথা হলো,সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের উঠাবসা, চলাফেরা ও কথাবার্তা লাগাতার চলতে থাকে। মুখ দিয়ে কী বের হচ্ছে এর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,এতে কি কারো মনে কষ্ট দেওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না,তারও খবর নেই। কী হবে এর পরিণতি।

পরিণতি সম্বন্ধে বেখবর হওয়া কখনো উচিত নয়। দুনিয়ার কাজকারবারে লিপ্ত হয়ে আখিরাতকে ভুলে যাওয়া অত্যন্ত বোকামি।
এ কথা স্মরণ রাখা উচিত,দুনিয়া থেকে আমার চলে যেতে হবে,আল্লাহর সামনে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি কাজ ও কথার জন্য আমার জবাবদিহি করতে হবে।

অসতর্কতা ও গাফিলতিতে আমার থেকে যেন এমন কোনো কথা ও কাজ প্রকাশ না পায়,যার ফলে আখিরাতে আমার পরিণতি খারাপ হয়। এ জন্য সর্বদা অন্তরে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ রাখবে। আল্লাহর নিয়ামতসমূহের শুকরিয়া জ্ঞাপন করবে।

সকল প্রয়োজনীয়তা আল্লাহর কাছে চাওয়ার অভ্যাস করবে। সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনাচরণ অধ্যায়ন করবে। যেমন-আম্বিয়ায়ে কেরাম,সাহাবায়ে কেরাম ও নেককার ওলী-বুজুর্গদের জীবনী পড়ার দ্বারাও আখিরাতের ফিকির ও আল্লাহর স্মরণ লাভ হয়ে থাকে। যেরূপ নেককার ওলী-বুজুর্গদের সংশ্রবে থাকার দ্বারা আখিরাতের ফিকির লাভ হয়, তদ্রুপ তাদের জীবনাচরণ পড়ার দ্বারাও তা অর্জিত হয়। আল্লাহর ভালোবাসাপ্রাপ্ত বান্দাদের জীবনী-কথাবার্তা অধ্যায়নের দ্বারা অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা গভীর হয়। অন্তরে ঈমান তাজা হয়,গাফিলতি দূর হয়ে আখিরাতের ফিকির পয়দা হয়। এতে অযথা ও মন্দ কথাবার্তা-কাজকর্ম থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। আল্লাহ তা’আলা নিজ দয়ায় আমাদের সকলকে এর তাওফীক দান করুন।

Wednesday, November 22, 2017

মুসলিম উম্মাহর নাক কেটে কলঙ্কিত এক পরাজয় উপহার দিয়ে ইরাক সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিদায় নিল ইসলামিক স্টেট্স ইন্ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া

মুসলিম উম্মাহর নাক কেটে কলঙ্কিত এক পরাজয় উপহার দিয়ে ইরাক সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিদায় নিল ইসলামিক স্টেট্স ইন্ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া।
মাওলানা হারুন ইযহার
(মাওলানা হারুন ইযহার)
অহমিকা,হঠকারিত আর সীমালঙ্ঘনের অপরিহার্য পরিণাম হলো পতন। এর আগে একই বাড়াবাড়ির কারণে বিগত শতকের শেষ দশকের আলজেরিয়ায় সশস্ত্র তৎপরতা চুড়ান্ত পর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছিল। আলজেরিয়া, তিউনেসিয়ার তাকফিরের গোষ্ঠীই আই এসে যোগ দিয়েছিল।

অনেকে আই এসকে ইসরাইল- আমরিকার সৃষ্টি এবং অনেকেই তাদেরকে খারেজী মনে করেন।এসব তথ্য ভুল। চিন্তার অালস্য আর তথ্য সংগ্রহের সাধনা না করে এরকম সস্তা মন্তব্য আমাদের মজ্জাগত স্বভাব। তবে তারা এসব ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ছিল তাদের অজানাতেই।

আমরা যদি বিচারমূলক মূল্যায়নে যেতে চাই তাহলে উম্মাহর ব্যর্থতার দৃষ্টান্তগুলো খুঁজে পাব মূলধারার নিয়মতান্ত্রিক ইসলামি আন্দোলনেও। উভয়টা ব্যর্থতা, রূপ ভিন্ন। একটা বাড়াবাড়ি একটা ছাড়াছাড়ি।
নিম্নে উভয় মানহাজের সমালোচনায় আমরা সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। 

মূলধারার ইসলামপন্থাকে বিদ্যমান রাষ্ট্রিক ও সামাজিক কাঠামোর বেলায় جاهلية আর طاغوت এর মত Term গুলো ব্যবহার করতে দেখা যায়না। شرك এর আধুনিক আপডেট যা প্রচলিত ঐ রাষ্ট্রিক কাঠামোর সাংবিধানিক চেতনায় বিদ্যমান তাকেও আকিদাহ্'র পরিভাষা দ্বারা ক্রিটিক করতে দেখা যায়না। আবার এসব উপসর্গের উপশম করে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে মেথডগুলো কোরআন,সুন্নাহ্ তথা সীরাতে বিবৃত আছে পরিস্ফুটভাবে যেমন -دعوة جهاد هجرة نصرة ولاء براء صلح عهد بيعة -এসবের কোন প্রকার দৃশ্যমান বাস্তবতা দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাবেননা এখানে। 

অর্থাৎ এসব পরিভাষার অনস্তিত্ব প্রচলিত ইসলামপন্থার চিরাচরিত ব্যাপার।

তো এটা কি নিছক উদাসীনতা নাকি গোড়ায় গলদ? মানে ইসলামপন্থীরা রাজনীতির মেরুকরণে আকীদাহ্'কে বিবেচ্য মনে করেননা? নবীর সা. অনুসৃত পথ ও পদ্ধতিকে বিস্মৃতির সিন্দুকে তালাবদ্ধ রেখে দিয়েছেন?

হ্যাঁ,এমনটাই মনে হয় বাস্তব। 

তাহলে বলা যায় মূলধারার ইসলামপন্থা একটা রাজনৈতিক بدعة এ লিপ্ত হয়েছেন। তারা مرجئه না হয়েও إرجاء এর শিকার ।

গণতন্ত্রের পিছনে কোন শক্তিশালী اجتهاد এবং تاويل খাড়া করতে পারেনি ইসলামপন্থীরা। শুধু কিছু আকাবিরদের নজির পেশ করা ছাড়া। অথচ আকাবিরীনে দেওবন্দ বা ইখওয়ানের প্রথম সারির মুরব্বীগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে স্থায়ী মানহাজ্ মনে করেননি কখনো। 

এটা হলো ইসলাম চর্চায় تفريط বা স্খলনের উদহারণ।

তাহলে إفراط বা সীমালঙ্ঘনের নজির কারা? তারা হলেন যারা جاهليه,طاغوت এবং আধুনিক شرك - এসব পরিভাষার বিচারে বিদ্যমান কাঠামোর সমালোচনা করেন। এটা করে তারা প্রমাণ করলেন তাদের আকিদাহ্'র পাঠ কতোটা সহিহ এবং সুসংহত। চিন্তার এ জায়গায় তারা উম্মাহর জন্য সঠিক পথপ্রদর্শক হতে পারতেন। কিন্তু মসিবত হলো তারা তাগুত, শিরক আর জাহিলিয়াতের প্রতিকারে অবিলম্বেই সশস্ত্র পন্থার মেথড প্রচারে সিদ্ধহস্ত। دعوة বিবর্জিত جهاد এর এমন এক খোঁড়া ও প্রতিবন্ধী কর্মসূচি তারা হাতে নিয়ে ফেললেন যা তাকফিরের পরিধি বিস্তৃত করল এবং নতুন فتنةএর জন্ম দিল।

এই মানহজকে আমরা ফিৎনা বলছি কেননা তারা কুফফার কর্তৃক বন্দুকের জোরে দখলকৃত ভূমি আর কুফফারের আইনে পরিচালিত মুসলিম জন অধ্যুষিত এলাকা - সবটাকে একাকার করে ফেলেছেন। 

এখানে তাদের ভুলটা তাদের নিয়্যাহ্ বা আকিদাহ্'র মধ্যে না। সমস্যাটা فقه الواقع এর উপলদ্ধির মধ্যে। যেটা হয়েছে সামগ্রিক উসূলী দৃষ্টিভঙ্গির স্থলে শরীয়াহ্'র খন্ডিত টেক্সটের আবেগপ্রবণ পাঠের কারণে। আই.এস বা داعش হলো এর একটা নজির, যারা خوارج নন কিন্তু তারা সে চেতনা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ।

তাহলে সলিউশন কী?

অতি সংক্ষেপে, আই এস কে তাদের আগের মুরুব্বীদের বাই'আত আর নীতিতে ফিরে যেতে হবে,বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যাদের কতৃত্ব অক্ষুন্ন আছে এখনো অদৃশ্যভাবে।

আর ইসলামি রাজনীতির মূলধারাকে তাদের বিংশ শতকের পূর্বসূরিদের বৈপ্লবিক দা'ওয়াতের লিটরিচারে ফিরে যেতে হবে। ইখওয়ানকে ফিরতে হবে কুতুবে, জামাতকে ফিরতে হবে প্রতিষ্ঠাকালের সেই আগের মূল বয়ানে , আর কওমীকে ফিরতে হবে দেওবন্দের চার মূলনীতিতে। কেল্লা ফতেহ্!

Tuesday, November 21, 2017

ভারত সরকারের অনুদান প্রত্যাখ্যান করলো দারুল উলুম দেওবন্দ!

ভারত সরকারের অনুদান প্রত্যাখ্যান করলো দারুল উলুম দেওবন্দ!
কি অবাক হলেন?
দারুল উলুম দেওবন্দ

নতুন কিছু নয় সেই ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ শুক্রবারের কথা।চলুন এবার জেনে মূল আলোচনার কথা।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দেওবন্দের দারুল উলুম সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাদের অধীনস্থ মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার আধুনিকীকরণের জন্য তারা কোনও সরকারি অনুদান নেবে না।
নরেন্দ্র মোদী সরকার এ বছর তাদের বাজেটে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের জন্য ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে, কিন্তু দারুল উলুম মনে করছে এই সরকারি সহায়তা নিলে তাদের মাদ্রাসাগুলোয় যে ধর্মীয় শিক্ষার পরম্পরা আছে তা ব্যাহত হবে।
দেওবন্দের দারুল উলুমের অনুমোদিত প্রায় তিন হাজার মাদ্রাসা আছে সারা দেশ জুড়ে আর এ সপ্তাহের গোড়ায় তাদেরই সংগঠন রাবতা-ই-মাদারিস-ই-ইসলামিয়ার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল দেওবন্দের ক্যাম্পাসে।
সেখানে ৪ হাজারেরও বেশি মৌলানার উপস্থিতিতে দারুল উলুম সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের শিক্ষাপদ্ধতি বা সিলেবাসের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না, আর তাই তাদের মাদ্রাসাগুলো এ জন্য সরকারি অনুদানও প্রত্যাখ্যান করবে।
দারুল উলুমের মাদ্রাসা বিভাগের অধিকর্তা মওলানা আবদুল খালেক এর কারণ ব্যাখ্যা করে বিবিসিকে বলেন, ‘দেড়শো বছরের পুরনো এই প্রতিষ্ঠান তাদের ইতিহাসে কখনও সরকারি অনুদান নেয়নি ভারতেরও না, বাইরের কোনো সরকারেরও না। দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতারাই এই বিধান করে গেছেন কারণ সরকারের টাকা নিলে তাদের কথাই তো আমাদের শুনতে হবে, আমরা আমাদের স্বাধীনতা হারাব!’
বস্তুত দারুল উলুমের প্রধান আশঙ্কা এটাই সরকারি অর্থ নিলে তাদের পাঠক্রম বা পড়াশোনাতেও সরকার নাক গলাবে।
দারুল উলুমের উপাচার্য আবুল কাশেম নোমানিও জানিয়েছেন, আধুনিকতার নামে তারা তাদের মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার বিশুদ্ধতা নষ্ট করতে পারবেন না।
বহু বছরের অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও বামপন্থী রাজনীতিক মহম্মদ সেলিমও মনে করছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার চাইলে সরকারকে অন্য রাস্তায় এগোতে হবে।
তার মতে, ‘ধর্মীয় শিক্ষায় সরকারের কোনো ভূমিকা দরকার নেই, টাকা দেওয়ারও দরকার নেই। ধর্মীয় শিক্ষা তাদেরই কাজে লাগুক, যারা ছেলেদেরকে মওলানা-মৌলবী-কাজী বানাতে চান!’
মহম্মদ সেলিম আরও বলেন, ‘যেখানে সাধারণ স্কুল-কলেজ নেই বা শিক্ষক নেই, সেখানে অনেকটা বাধ্য হয়েই লোকে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সরকার বরং বেশি করে স্কুল-কলেজ করুক তাহলে তাদের মাদ্রাসাতেও নাক গলাতে হবে না, মাদ্রাসাগুলোকেও সরকারি অর্থের ভরসায় থাকতে হবে না!’
বস্তুত সরকার দেশের যে সব মাদ্রাসায় নাক গলিয়েছে, সেখানে পড়াশোনা লাটে উঠেছে বলেই দাবি করছেন দারুল উলুমের কর্তৃপক্ষ।
মওলানা আবদুল খালেক বলেন, ‘সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসায় পড়াশোনা কিছু হয় না সেখানে শিক্ষকরা শুধু সরকারের কাছ থেকে মাইনে পেয়েই খালাস। তাদের পড়াশোনার তাগিদ থাকে না, ছাত্রদেরও শেখার গরজ থাকে না। দেশে সবচেয়ে বেশি সরকারি অনুদান-পাওয়া মাদ্রাসা আছে বিহারে, সেগুলোর সবই একেবারে মৃতপ্রায় দশা!’
ভারত সরকার অবশ্য মনে করছে, প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে ইংরেজি বা কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো বিষয় এনেই ওই শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কার করতে হবে এবং তার জন্য তারা অর্থ খরচেও প্রস্তুত।
কিন্তু দারুল উলুমের সিদ্ধান্ত থেকেই পরিষ্কার, মাদ্রাসা আধুনিকীকরণে সরকারের এই কর্মসূচী রীতিমতো প্রতিরোধের মুখে পড়তে চলেছে।

Saturday, November 18, 2017

কওমি সনদের স্বীকৃতি, দলাদলি ও একটি পর্যালোচনা

মাহমুদ মুজিব ●
আল্লামা আহমদ শফি সাহেবের নেতৃত্বে সব শিক্ষাবোর্ড ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে সনদের সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে তুলকালাম ও বিতর্কের অবসান ঘটে। তার আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকটা সাংঘর্ষিকও। ব্যক্তি নিয়ে মাতামাতি। বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব। নেতৃত্বের ব্যাপারে অনৈক্য। মধ্যস্থতার প্রতি অনীহা। তারও আগের অবস্থা ছিলো আরও নাজুক। একপক্ষ স্বীকৃতি নিতে মরিয়া। অপরপক্ষ স্বীকৃতি নেয়া হারাম ভাবতেন। স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যতা বিনষ্টের অজুহাত দেখাতেন। তারা দেওবন্দের মরহুম মারগুবুর রহমান রহ.-এর ফতোয়া প্রচার করতে লাগলেন জোরেশোরে। তার সাথে মুফতি আব্দুর রহমান রহ.-এর একটা বক্তব্য গণহারে ছাপিয়ে বিতরণ করেছেন। অথচ যারা ইতোপূর্বে হযরতের ওফাত পর্যন্ত কোন বিষয়েই হযরতের সাথে একাত্মতা পোষণ করতেন না। এমনকি হযরতের সম্পৃক্ততা বা তত্ত্বাবধান সহ্য করতেন বলে মনে হতো না।

যাহোক অবশেষে স্বীকৃতি নেয়ার ব্যাপারে সকলে একমত। ওস্তাদুল ওলামা আল্লামা শাহ আহমদ শফি সাহেবের নেতৃত্বে, সরকারের আওতাবহির্ভূত হবে এ স্বীকৃতি।

(সনদ নিলে লাশ পড়া, অমুক সরকার থেকে স্বীকৃতি নেবো না) এমন সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে হঠাৎ করে সবাই সনদ নেয়া ও সরকারের সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিষয়ে অনেকে অনেক কিছু বলছেন। ব্যক্তিবিশেষকে দুষছেন। আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সেদিকে যাওয়া অপ্রয়োজন মনে করছি। কমিটি গঠনের সময় হলো। কো-চেয়ারম্যান পদ ও প্রতিটি বোর্ড থেকে কতজন সদস্য করা হবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগলো। কমিটি গঠনের পর ১১ এপ্রিল ২০১৭ ইং গণভবনে শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও বোর্ড প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মর্মে ঘোষণা দেন যে, কওমী মাদরাসার স্বতন্ত্র-বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও দারুল উলূম দেওবন্দের মূলনীতিসমূহকে ভিত্তি ধরে কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবী) এর সমমান প্রদান করা হল ৷

দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণার পর ১৫ মে ২০১৭ প্রথমবারের মতো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আল হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমীয়া বাংলাদেশের অধীনে মোট ১৯ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।

পরীক্ষা গ্রহণের পর স্বীকৃতির আইনগত ভিত্তি অর্জনের লক্ষ্যে লিঁয়াজো কমিটি দুয়েকবার সরকারের সঙ্গে বসেছেন। সরকার একটা গঠনতন্ত্র, শিক্ষা সিলেবাস চাইলেন। লিঁয়াজো কমিটি তা উপস্থাপন করলো। হাইআতুল উলইয়ার জন্যে সরকার জমি বরাদ্দের ঘোষণা দিলেন।

পরবর্তীতে মঞ্জুরী কমিশন আইনের খসড়া তৈরি করার লক্ষ্যে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি এবং ইউজিসির ৪ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কমিটি ঘোষণা করেন৷ যে কমিটিতে হাইয়াতুল উলইয়ার কোনোও প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি।

মঞ্জুরী কমিশন আইনের খসড়া তৈরি করার লক্ষ্যে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি এবং ইউজিসির ৪ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কমিটি ঘোষণা করেন৷ যে কমিটিতে হাইয়াতুল উলইয়ার কোনোও প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি

গত ৯/১১/২০১৭ ইং তারিখ বেফাক ছাড়া অন্য ৫টি বোর্ডের দায়িত্বশীলগণ বেফাকের প্রতি অনিয়ম ও একক সিদ্ধান্তের অভিযোগ এনে ইত্তেহাদ মহাসচিব আল্লামা আব্দুল হালিম বেখারীর সভাপতিত্বে চট্টগ্রামে মিটিং করেন। ৫ বোর্ড ৫টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের সামরিক সচিবের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করতে গিয়ে কেউ কেউ খুব অতিরঞ্জন করে ফেললেন।

অন্যান্য ৫টি বোর্ডকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু হলো। আর কেউ বেফাককে একতরফা দোষারোপ করতে লাগলো। বেফাক সমর্থকরা বলছেন- বেফাক শীর্ষ বোর্ড, সর্বপ্রাচীন বোর্ড, মাদরাসা ও পরীক্ষার্থী বিবেচনায় বেফাক সবার ঊর্ধ্বে। বলা হয় অন্য বোর্ডগুলো আঞ্চলিক আর বেফাক হলো জাতীয় বোর্ড। তাই বেফাকের ক্ষমতা ও অধিকার বেশী।

যে যাই বলুক, একথা সর্বজনসম্মত যে, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ বর্তমানে শীর্ষ বোর্ড। প্রচার ও প্রকাশনায় বাকি সব বোর্ড থেকে অনন্য ও উচ্চতায়। রেজাল্ট প্রকাশ অনলাইন সমৃদ্ধকরণ হয়েছে। এটা বেফাকের সফলতা বলা চলে।

তবে একথাও মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশ কওমি শিক্ষা নিয়ে আগে থেকে কয়েকটি বোর্ড ছিলো- আজাদ দ্বীনি এদারা, ঈত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ ( ১৯৫৯), তানযিমুল মাদারিসিল কওমিয়্যাহ, এসব বোর্ড না হলে বেফাকুল মাদারিসের অস্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠা কল্পনাও করা যেতো না। তাছাড়া সব শ্রেণির পরীক্ষা নেয়ার জন্য বেফাকের জন্মও হয়নি। অন্য বোর্ডের দায়িত্বশীলদের পরামর্শ ও অর্থ অনুদানের মাধ্যমেই বেফাক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আমরা কারও কারও কিছু কিছু কর্মে খাই খাই মানসিকতা দেখতে পাই। তরুণ অনেকেই ইতিহাস জানে না। আঞ্চালিক বলে বলে একধরনের গালি দেয়া হচ্ছে প্রাচীন বোর্ডগুলোকে। পটিয়ার বোর্ডেতো সেই বগুড়ার হাজার হাজার মাদরাসাও পরীক্ষা দিতো। তাহলে এটা আঞ্চলিক বোর্ড হয় কি করে। আজাদ দ্বীনি এদ্বারা সর্বপ্রাচীন বোর্ড, এরপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইত্তেহাদুল মাদারিস, তানযিমুল মাদারিস, তারপরেই বেফাকুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠা।

আঞ্চালিক বলে বলে একধরনের গালি দেয়া হচ্ছে প্রাচীন বোর্ডগুলোকে। পটিয়ার বোর্ডেতো সেই বগুড়ার হাজার হাজার মাদরাসাও পরীক্ষা দিতো। তাহলে এটা আঞ্চলিক বোর্ড হয় কি করে। আজাদ দ্বীনি এদ্বারা সর্বপ্রাচীন বোর্ড, এরপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইত্তেহাদুল মাদারিস, তানযিমুল মাদারিস, তারপরেই বেফাকুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠা

তন্মধ্যে ১৯৫৯ ইং সনে আল জামেয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রামের মুহতামিম শায়খুল আরব ওয়াল আজম হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ.-এর তত্ত্বাবধানে ইত্তেহাদুল মাদরিস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর ১৯৭৮ ইং সনে বেফাকুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠা হয় ইত্তেহাদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিরই তত্ত্বাবধানে। পটিয়ার মুহতামিম হাজী সাহেব হুজুর আমৃত্যু ইত্তেহাদের পাশাপাশি বেফাকেরও সভাপতি ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর পটিয়ার পরবর্তী মুহতামিম আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী ইত্তেহাদ ও বেফাকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি বেশীদিন বেফাকে সম্পৃক্ত থাকতে পারেননি। কোনো একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পটিয়া ও বেফাক আলাদা হয়ে যায়। এতে ঢাকাস্থ দায়িত্বশীলদেও আন্তরিকতাকেই দায়ি করেন পটিয়ার আলেমগণ। বেফাক কার্যালয়ের জমিটি জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া ও ইত্তেহাদুল মাদারিসের ফান্ডের কেনা। এজন্যই বলতে চাই, যাকে নিয়ে নাচো, তার সম্পর্কে জেনে নাও না একটু। কারও অবদান কম নয়। এখন যারা ভোগ বিলাসে আত্মনিমগ্ন তাদের বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।

পরে অফিস নির্মাণের লক্ষ্যে জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইত্তেহাদুল মাদারিসের বর্তমান সভাপতি আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী সৌদির এক সংস্থাকে দরখাস্ত করলে ইট, রড, সিমেন্টের ব্যবস্থা হয়। এসবের প্রমাণ ও সাক্ষীরা এখনো জীবিত আছেন। সুতরাং এসব অবদান ও ইতিহাস অস্বীকার করা বেফাকের অতিউৎসাহী সমর্থকদের পক্ষে বেমানান, অসুন্দর, অসম্ভবও বটে।

আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী সৌদির এক সংস্থাকে দরখাস্ত করলে ইট, রড, সিমেন্টের ব্যবস্থা হয়। এসবের প্রমাণ ও সাক্ষীরা এখনো জীবিত আছেন। সুতরাং এসব অবদান ও ইতিহাস অস্বীকার করা বেফাকের অতিউৎসাহী সমর্থকদের পক্ষে বেমানান, অসুন্দর, অসম্ভবও বটে

৫ বোর্ডের সমর্থকরা মিটিং নিয়ে যেমন মনে করছেন ঠিক তেমন নয়। বেফাকের প্রতি এসব অভিযোগ সরাসরি বেফাকের কর্নধার ও যথাযথ দায়িত্বশীলদের জানালে সমাধান হতো। হলেও হতে পারতো।

এখানে একটা বিষয় বলে রাখি, বেফাকুল মাদারিস যদিও ইত্তেহাদুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় তাদের সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।

বেফাক ও ৫ বোর্ড দ্বন্দ্বে বিতর্ক না করাটাই ভদ্রতার বহিঃপ্রকাশ। আর এ বিতর্কের অবসান ঘটাতে ৬ বোর্ডের দায়িত্বশীলগণ আবারও একটেবিলে বসতে হবে। তাহলে পরস্পর দোষাদোষি বন্ধ হবে। ছোটোখাটো মতপার্থক্যের কারণে সনদের স্বীকৃতি যেনো থেমে না যায় এটাই কামনা থাকবে। আর স্বীকৃতির নামে যেনো কোন বিকৃতি না হয় সেদিকটিও লক্ষ্য রাখতে হবে। সমালোচনার জন্য ভদ্রতা জ্ঞানও আবশ্যক। সবার আগে বাস্তব ইতিহাস জানা উচিত। তারপর বাক্যস্তুতি জাতিকে জানানো উচিত।

লেখক : কওমী মাদরাসা ছাত্র পরিষদ বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারি ও জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রাম-এর শিক্ষক।

সৌদি প্রধান মুফতী বিরোধী অপ-প্রচার উম্মার জন্য আত্মঘাতী

গতকাল থেকে কিছু মিডিয়ার সূত্র ধরে সৌদি গ্রান্ড মুফতীকে বিভিন্ন মহল থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে যা সুন্নী মুসলীমদের জন্য আত্মঘাতী। তিনি নাকি ফতোয়া দিয়েছেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ! তাই গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শেখের নাকি ভূয়শী প্রশংসা করেছেন ইসরাইলের যোগাযোগ মন্ত্রী"।

ফেইসবুকে সাধারণত কোন নিউজ শেয়ার করলে অনেকে লিংক খোঁজেন। লিংক দিলেই যেন দলীল হয়ে গেল! আচ্ছা লিংকের সব দলীল কি সত্য? মোটেই নয়। যেমন, কয়েকমাস আগে বাবরী মসজীদের জন্য ভোট চেয়ে ব্যাপাকভাবে একটি লিংক ছড়িয়ে দেয়া হয়। সে ফাঁদে আবেগে পা দেন উচ্চশিক্ষিত -নিম্ন শিক্ষিত সবাই। কেউ বিরোধীতা করলে দুইচারটা লিংক দেয়া হত। পরে জানা গেল বিষয়টা পুরা ভুয়া! এভাবে ভুয়া নিউজের হাজারো উদাহারণ দেয়া যাবে।

অনেকে বলবেন ফতোয়ার নিউজটি অমুক-তমুক জাতিয় দৈনিক প্রকাশ করেছে! আচ্ছা, জাতিয় দৈনিকের সব খবর কি নির্ভুল বা বিশ্বাস যোগ্য? যেমন, ৫ ইমে হেফাজত ইসলামের বিরুদ্বে হাজার-হাজার গাছ কাটা আর পবিত্র কোরান পোড়ানোর নিউজ করেছিল দেশের প্রায় মিডিয়া। হেফাজত ইসলামের সেই কোরান পোড়ানোর অভিযোগ কি বিশ্বাস যোগ্য? অবশ্য নাহ, কিন্তু আপনার কাছে চরম অবিশ্বাস্য এই খবর বিদেশীদের কাছে বিশ্বাস যোগ্য করে তুলতে পারে মিডিয়া। তারাও জাতিয় দৈনিকের রেফারন্স দিবে তাই না? সৌদি গ্রান্ড মুফতী অনুরুপ কোন ইসলাম বিদ্ধেষীদের চক্রান্তের শিকার বলে আমি মনে করি।

শিয়া-সুন্নী ইস্যুতে উত্তপ্ত মধ্যেপ্রাচ্য। সুন্নী ওলামা এবং সৌদি বিদ্ধেষ ছড়িয়ে আমাদেরকে বিভক্ত করার ফাঁদের কথা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? সৌদির গ্রান্ড মুফতী একজন বিশ্ববরেণ্য ইসলামী স্কলার, সম্মানিত ব্যাক্তি। তিনি সে মহান সৌভাগ্যবান আলেম যিনি বছরের পর বছর আরফাতে খোৎবা দিয়েছেন। ওনার জ্ঞানের বিশালতা মহান রবের নেয়ামত। আপনি যে পক্ষের বা যে মতবাদের হোন না কেন উম্মার এই মহান রত্নের বিপক্ষে কিছু বলার আগে নিজের অবস্থান ভেবে দেখা দরকার।

আচ্ছা যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম, তিনি হয়ত এই ফতোয়া দিয়েছেন। কিন্তু ফতোয়ার মূল প্রেক্ষাপট না বুঝলে কোন ফতোয়া বুঝা যাবেনা। যেমন, দরুণ উদাহারণ স্বরুপ আমি একটা ফতোয়া দিই! কেউ আমাকে প্রশ্ন করলো ইসরাইলী ইহুদী হত্যা কি জায়েজ? উত্তরে আমি বল্লাম, বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে কোন মানুষ হত্যা জায়েজ নাই, সে ইয়াহুদী,খৃষ্টান হোক বা অন্য যে কোন ধর্মের হোক। এখন কেউ মিডিয়ায় শিরোণাম করে দিতে পারে ইসরাইলী ইহুদী হত্যা হারাম ফতোয়া দিয়েছে শিশির!"। এখানে মিডিয়ার শিরোনাম সত্য কিন্তু ফতোয়ার মূল জবাব বিকৃত, লুকায়িত। অনুরুপ কোন আলেম যদি বলে মরা গরুর মাংস জায়েজ! তখন এই ফতোয়ার প্রেক্ষাপট, অবস্থা বিশ্লেষণ না করলে বিভ্রান্ত হবে। আপনি এমন স্থানে গেছেন যেখান মরা গরুর মাংস ছাড়া কিছু নাই, তখন বাধ্য হয়ে জান বাঁচানোর জন্য মরা গরুর মাংস ভক্ষণ জায়েজ। এর মানে, এই নয় সর্বাবস্থা মৃত গরুর মাংস হালাল। কিন্তু মিডিয়া শিরোনাম করে দিতে পারে অমুক মাওলানা ফতোয়া দিয়েছে মরা গরুর মাংস হালালা!

আমি বুঝাতে চেয়েছি যে কোন ফতোয়ার মূল প্রেক্ষাপট, ফতোয়ার ভিত্তি বিচার বিশ্লেষণ না করলে সব উলোটপালুট হয়ে যাবে। তাছাড়া বর্তমান যুগে ভিডিও পর্যন্ত কাটছাঁট করে বিকৃত করে ফেলা হয়। তাই কারো বক্তব্য বিকৃত করা কোন ব্যাপার না। মুফতী সাহেবের ফতোয়ার নিউজ শতভাগ শত্য অথবা সম্পূর্ণ মিথ্যা কোনটাই দাবী করতেছিনা। তবে ওনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

সৌদি গ্রান্ড মুফতী পুরা উম্মার শ্রদ্ধেয়, সম্মানিত ব্যাক্তি। কোন বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও উনার সম্মানহানি আত্মঘাতী। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন, উম্মার ঐক্য দৃঢ় করার তাওফিক দান করুন।

আমার এই লেখা যৌক্তিক মনে হলে কপি/শেয়ার করতে পারেন। ভুল বা দ্বিমত থাকলে তাও জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।

ফেসবুক-Muhammad Hasanথেকে সংগ্রহ

Sunday, September 11, 2016

আরাফার ময়দানে নূতন খতীব ডঃআব্দুর রাহমান সুদাইস হাফিজাহুল্লাহ!

আরাফার ময়দানে নূতন খতীব ডঃআব্দুর রাহমান সুদাইস হাফিজাহুল্লাহের আজকের খুৎবার সরাংশ!

খুৎবায় মুসলিম নেতৃবৃন্দ,মজলুম মুসলমান ও বিশ্ব মুসলমানদের নানাবিধ সমস্যার কথা উঠে এসেছে । 
---------------------------------------------------------------------------------------
আরাফার খুতবা ১৪৩৭ হিজরি ; খতিব: শেইখ ড. আব্দুর রহমান সুদাইস

হামদ ও ছানা এবং দরুদ পাঠের পর খতীব বলেন, আমি সকলকেই তাকওয়া অর্জনের অসিয়ত করছি। হে মুসলিম জাতি, আল্লাহ তায়ালা সারা বিশ্ব বাসির জন্য অস্ংখ্য নবী পাঠিয়েছেন। তারা মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। সবশেণষে আমাদের নবী মুহাম্মদ স. কে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হেদায়েতের পথ দেখিয়েছেন। তাওহীদের দীক্ষা দিয়েছেন।সম্মানিত হাজি সাহেবগন, এই মাঠেই আমাদের নবী দাড়িয়েছেন। ইসলামের মূল বিষয়ুগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন। জাহিলিয়াতের সকল খারাপ বিষয়গুলোকে মিটিয়ে দিয়েছেন। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। মানুষকে অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে আলো ও জ্ঞানের দিকে আহবান জানিয়েছেন। নারির প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের সকল অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলেছেন। মুসলমানের রক্ত সম্মানিত। এক্ষেত্রে সকলকেই সতর্ক থাকতে বলেছেন।
হে মুসলিম নেতৃবৃন্দ! সারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানেদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটু সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। এ বিষয় নিয়ে প্রয়োজনে আলোচনায় বসতে হবে। মসজিদে আকসাকে মুক্ত করতে হবে।
হে মুসলিম তরুন! বর্তমানে সারা বিশ্বে যে বিষয়টি নিয়ে সবচাইতে বেশী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো সন্ত্রাসবাদ। অনেক তরুণ ইসলমের মূল শিক্ষা ভুলে ভিন্ন স্থান থেকে ইসলাম শিখছে।বিভিন্নভাবে ভিবিষিকা ও উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে। অযথাই মানুষকে কাফের বলে দিচ্ছে। হেতরুণ তোমরাই জাতির মেরুদন্ড। অতএব তোমরা সতর্ক হও। অন্যকে যেকোন কিছুতেই কাফের বলা থেকে বিরত থাকো। যেকোন বিষয় তোমরা আলেমদের নিকট থেকে গ্রহন কর। তোমাদের নিকট অনেক প্রত্যাশা। তোমরা সুন্দর আদর্শ গ্রহন কর। নিজেকে বিনির্মান করো।
হে অভিভাবক ও মুরুব্বিগণ! চরিত্র প্রধান এক সম্পদ। ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের সকলের চরিত্র বিনির্মানের প্রত্রি লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশেষত বর্তমানে যে চারিত্রিক যুদ্ধ সে ব্যাপরে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক সদস্যের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
হে ওলামায়ে কেরাম! আপনার সকলেই রাসুলের উ্ত্তরসূরী। অপনারা মানুষকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত না করে কোরআন সুন্নাহর প্রতি উদ্বুদ্ধে করুন। মানুষকে সঠিক বিষয়টি শিক্ষা দিন।
হে ইসলামের দায়ী ও আহবায়কগণ! আপনারা মানুষের প্রতি সহজ করুন্। দলা দলি মুক্ত থাকুন্। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর দিকে ডাকুন। মানুষের প্রতি দয়া করুন, রহমত করুন।
হে মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ! আপনারা সতর্ক হোন। মানুষের চারিত্রিক বিষয় গুরুত্ব দিন। ইসলামমের শিক্ষা ও দীক্ষা প্রচার করুন।
হে হাজিবৃন্দ! আপনারা শুকরিয়া আদায় করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে হজের জন্য কবুর করেছেন। এই আরাফায় অবস্থানের তাওফীৗক দিয়েছেন। সাথে সাথে আপনাদের জন্য যারা এই ব্যবস্বথা করেছেন, তাদের জন্য দো্‌াআ করুন। বিশেষ করে খাদেমুল হারামাই মালিক সালমানের জন্য। এবং যারা সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন
হে বায়তুল্লাহর হাজিগণ! আপনারা আরাফায় অধিক পরিমানে দোআ করুন। আরাফার দোআ সব থেকে উত্তম দোআ। এদিন আল্লহ তাআলা গর্ব করেন। অধিক পরিমানে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এখানে জোহর আছর কসর করে জমা করুন। দোআয় লিপ্ত থাকুন। সূযাস্ত পর্যন্ত দোআ করতে থাকুন। এর পর শান্তভাবে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা হোন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব এশা এক আজানে দুই এক্বামতে আদয়া করুন।
এরপর জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য যেথে থাকুন্। কোরবানী করুন্। মাথা চেছে বা ছেটে হালাল হোন। এভাবে হজের কার্যক্রম সমাপ্ত করুন।

এরপর শায়েখ দোয়ার মাধ্যমে খুতবা সমাপ্ত করেন। মধ্যখানে শায়খ বলেন মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করাও আমাদের প্রয়োজন। দীর্ঘ ৩৫ বছর এই মিম্বরে দাড়িয়ে শায়খ আব্দুল আযীয আলে শায়খ খুতবা দিয়েছেন। মানুষকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নসীহত করেছেন। অসুস্থতার কারণে তিনি আজ খুতবা দিতে সক্ষম হননি। তার জন্য দোআ করি, আল্লাহ তায়ালা তার ইলমে, হায়াতে বরকত দান করুন। তাকে সুস্থতা দান করুন।