নোটিশ
আপনি কি ব্লগ কিংবা ফেসবুকে ইসলাম এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে আগ্রহী?
তাহলে আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ দিন। ধন্যবাদ
Showing posts with label বিশ্বনবী সা: এর সিরাত. Show all posts
Showing posts with label বিশ্বনবী সা: এর সিরাত. Show all posts

Sunday, December 10, 2017

নবীজি যখন স্বামী!


আতিক উল্লাহ
আমাদের ইসলাম শ্রেষ্ঠ কেন? কারণ ইসলামই একমাত্র জীবনঘনিষ্ঠ ধর্ম। জীবনে প্রতিটি দিকেই ইসলাম দিক-নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। খাওয়া-শোয়া। বাজার-সরকার। পড়া-লেখা। জিহাদ-কিতাল। ঘরসংসার-দেনদরবার। ওজু-গোসল। বাসরঘর-রান্নাঘর। ড্রয়িংরূম-বাথরূম সব জায়গার আদর্শ আমাদের নবীজি রেখে গেছেন।

আজ আমরা দেখবো তিনি স্বামী হিশেবে কেমন ছিলেন। আমাদের কল্পনায় একজন স্বামীর যা যা গুণ থাকতে পারে, তার মধ্যে এর চেয়েও হাজারগুণ বেশি গুণাবলী বিদ্যমান ছিল।

নবীজ সা. স্ত্রীদের কাছে সবচেয়ে বড় সান্তনার জায়গা ছিলেন। তাদের অশ্রু মুছে দেয়ার মাধ্যম ছিলেন। তিনি স্ত্রীদের কোনও কথাকেই হেসে উড়িয়ে দিতেন না। তাদের আবেগ-অনুযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাদের মনোভার লাঘব করার চেষ্টা করতেন।

বর্তমানে বাজারে, সুখি দাম্পত্যজীবন বা সফল কপল বা কিভাবে ভালো স্বামী/স্ত্রী হবেন, মেসালি বিবি-শাওহার-এ ধরনের অনেক চটকদার বই পাওয়া যায়। কিছু বই বেস্টসেলারও হয়। কিন্তু কোনও বইই নবীজির মতো স্বামীর পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারবে না। নবীজির দাম্পত্যের অন্দরে একটু ঢুঁ মেরে দেখা যাক:

(এক) পাত্রের একই স্থানে মুখ লাগিয়ে পানাহার করতেন নবীজি:
আমি (আয়েশা) পান করে পাত্রটা নবীজির দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি আমার এঁটো করা স্থানেই মুখ লাগিয়ে পান করতেন। দাঁত দিয়ে গোশত ছিঁড়ে খাওয়ার পর আমার লালা লেগে থাকা স্থানেই তিনি মুখ লাগিয়ে খেতেন (মুসলিম)।

(দুই) স্ত্রীর গায়ে হেলান দিয়ে বসা:
তিনি আমি হায়েয অবস্থায় থাকলেও, আমার কোলে হেলান দিয়ে বসতেন (আয়েশা রা.-মুসলিম)।

(তিন) চুল আঁচড়ে দেয়া। নখ কেটে দেয়া:
তিনি মসজিদে থাকলেও, জানালা দিয়ে মাথাটা আমার হুজরার দিকে বাড়িয়ে দিতেন, আমি তার চুল আঁচড়ে দিতাম (আয়েশা রা.-মুসলিম)।

(চার) নবীজি সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন। ফাঁকে ফাঁকে স্ত্রীদেরকে সময় দিতেন। তবে রাতের বেলায়, চারদিক নিরব হয়ে এলে, তিনি আয়েশা রা.-এর সাথে ঘুরতে বের হতেন। হাঁটতে হাঁটতে কথাবার্তা বলতেন (বুখারী)।

(পাঁচ) স্ত্রীদের সাথে নবীজি হাসি-মজা করতে ভালোবাসতেন। তিনি নিজেই শুধু গল্প বলতেন তা নয়, স্ত্রীদের কাছ থেকেও গল্প শুনতেন। একবার আয়েশা রা. তাকে শুনালেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ!
ধরা যাক আপনি উট নিয়ে কোনও এক চারণভূমিতে গেলেন। সেখানে একটা গাছ আছে, যার পাতা আগেই খেয়ে ফেলা হয়েছে। আরেকটা গাছ আছে, যেটার পাতা এখনো অক্ষত! আপনি কোন গাছের কাছে উটকে নিয়ে যাবেন?
যে গাছে এখনো কোনও কিছু মুখ দেয়নি সেটার কাছে নিয়ে যাবো!
আয়েশা বোঝাতে চেয়েছিলেন, নবীজির স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বিয়ের সময় কুমারী ছিলেন। বাকীদের সবাই আগে অন্য স্বামীর ঘর করেছেন। (বুখারী)।

(ছয়) নবীজি গৃহস্থালি টুকিটাকি কাজেও হাত লাগাতেন। এটাসেটা করতেন। পুরোদস্তুর সাংসারিক। গৃহী।
নবীজি ঘরে থাকলে কী করতেন?
তিনি পরিবারের কাজে অংশ নিতেন! (বুখারী)।

(সাত) শুধু স্ত্রীদের ভালোবাসতেন না কিন্তু নয়, তাদের বান্ধবীদেরকেও ভালোবাসতেন। খোঁজখবর রাখতেন। যোগাযোগ ছিন্ন হতে দিতেন না। এটা সেটা হাদিয়া পাঠাতেন। ছাগল যবেহ হলেই কিছু গোশত আলাদা করে বলতেন:
এটা খাদীজার (অমুক) বান্ধবীর বাড়িতে দিয়ে এসো! (মুসলিম)।

(আট) মানুষ প্রশংসা ভালোবাসে। স্বীকৃতি চায়। স্ত্রীও স্বামীর মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে চায়। গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠতে চায়। নবীজিও স্ত্রীদের প্রশংসা করতেন:
সারীত যেমন সমস্ত খাবারের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, আয়েশাও তেমনি অন্য নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ (মুসলিম)।
সারীত হলো রুটির টুকরোকে ঝোলে ভিজিয়ে তৈরী করা এক প্রকার খাবার!

(নয়) আশেয়া রা.-এর কাছে তার ছেলেবেলার বান্ধবীরা আসতো। তার বয়েস তখনো কমই ছিল। পুতুল খেলতে পছন্দ করতেন। সইদের সাথে তিনি খেলতেন। নবীজি ঘরে এলে, খেলতে আসা সেহেলীরা পালিয়ে যেতো। নবীজি তাদেরকে অভয় দিয়ে আয়েশার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। খেলার সুযোগ করে দিতেন (মুসলিম)।

(দশ) ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার বস্তু নয়। যদি সেটা হালাল হয়। নিজের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও অন্যদের কাছে প্রকাশ করা যায়। খোদ নবীজি বলেছেন:
আমাকে খাদীজার ভালোবাসা দান করা হয়েছে। (তার প্রতি আমার ভালোবাসাটা আল্লাহর তরফিয়া)। মুসলিম।

(এগার) স্ত্রীর শুধু দোষ নয়, তার গুণগুলোও খুঁজে বের করা দরকার। সেগুলো প্রকাশ করা দরকার। অপছন্দনীয় কিছু দেখলে অমনিই তেতে ওঠার কোনও কারণ নেই:
স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যেন অন্যায় আচরণ না করে। তার কোনও একটা স্বভাব পছন্দ না হলেও, আন্য আরেকটা স্বভাব পছন্দ হবে! (মুসলিম)

(বারো) নবীজি বেগানা কোনও নারীর প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। কিন্তু রাস্তায় হাঁটলে অজান্তেই চোখ পড়ে গেলে, ঘরে চলে আসতেন:
তোমাদের যদি বেগানা কোনও নারীর দিকে তাকিয়ে ফেলে, মনে ‘ভিন্নচিন্তা’ জাগ্রত হলে, সে সাথে সাথে স্ত্রীর কাছে চলে যাবে। নিজের প্রয়োজন পুরো করবে (মুসলিম)।

(তেরো) একান্ত ঘরোয়া ব্যাপারগুলো বাইরের কারো কাছে না ভাঙা। দু’জনের গোপন বিষয় দু’জনের কাছেই থাকতে দেয়া:
কেয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তি হবে যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সেটা অন্যদের কাছে ফাঁস করে দেয় (মুসলিম)।

(চৌদ্দ) নবীজি স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসাকে নানাভাবে প্রকাশ করতেন। তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়ার সামান্যতম সুযোগও হাতছাড়া করতে চাইতেন না। তিনি রোযা থাকাবস্থায় চুমু দিয়ে ভালোবাসার জানান দিতেন (মুসলিম)।

(পনের) নবীজি পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। সব সময় স্ত্রীদের কাছে আসার আগে নিজেকে সুন্দর-সুগন্ধিময় করে নিতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
আমি তার চুলের সিঁথিতেও মিশকের সাদা অবশিষ্টাংশ দেখেছি। তখন তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলেন (মুসলিম)।

(ষোল) নবীজি সা. পালাক্রমে সব বিবির সাথে থাকতেন। আয়েশার প্রতি তার আলাদা একটা টান ছিল। নবীজি সব বিবির প্রতিই ইনসাফ কায়েম করার চেষ্টা করতেন। সাহাবায়ে কেরাম খোঁজ রাখতেন, নবীজি আয়েশার ঘরে কোনদিন যাবেন। সেদিন তারা বেশি বেশি হাদিয়া পাঠাতেন। নবীজির সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে (মুসলিম)।

(সতের) স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রাখা। তার মনকে বুঝতে পারা স্বামীর কর্তব্য। নবীজিও বিবিদের কার মেজায কেমন, বুঝতে পারতেন। সেটার প্রতি সম্মান দেখাতেন:
আয়েশা! আমি বুঝতে পারি, তুমি কখন আমার প্রতি রাজি থাকো আর কখন আমার প্রতি নারায থাকো! তুমি আমার প্রতি খুশি থাকলে বলো:
মুহাম্মদের রবের কসম!
আর আমার প্রতি অখুশি থাকলে বলো:
ইবরাহীমের রবের কসম! (মুসলিম)।

(আঠার) উমার রা. বলেছেন:
আমার স্ত্রী একবার আমার এক সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করলো। আমাকে সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করতে বললো। আমি অস্বীকৃতি জানালাম। স্ত্রী বললো:
বা রে! নবীজির স্ত্রীরা পর্যন্ত নবীজির কাছে কোনও কোনও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আবেদন জানাতেন! আর আপনি আমার ক্ষেত্রে অস্বীকার করছেন? উম্মুল মুমিনীনদের কেউ কেউ তো নবীর সাথে রাগ করে একদিন একরাত পর্যন্ত কথা বলেন নি, এমনো হয়েছে! (বুখারী)।

আহা নবীজিও! কী অসাধারণ সহনশীল মানুষ ছিলেন তিনি!

(উনিশ) আয়েশা রা. বলেছেন:
রাসূলুল্লাহ সা. কখনোই কোনও স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেননি (নাসায়ী শরীফ)। 
আর এখন এসিড পর্যন্ত ছুঁড়ে মারে। কথায় কথায় ডিভোর্স!

(বিশ) সাফিয়া রা. এক সফরে নবীজির সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। সাফিয়া কিছুটা ধীরে পথ চলছিলেন। পিছিয়ে পড়েছিলেন। নবীজি তার কাছে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলেন সাফিয়া কাঁদছেন আর বলছেন:
আপনি আমাকে একটা ধীরগামী গাধায় সওয়ার করিয়েছেন!
নবীজি স্নেহভরে সাফিয়ার চোখের অশ্রু মুছে দিলেন। তাকে না কেঁদে চুপ করতে বললেন (নাসায়ী)।
তিনি কতোই প্রেমময় ছিলেন। আমি হলে কী করতাম! দ্রুত চলতে না পারলে কেন এসেছ!

(একুশ) নবীজি আরও অবিশ্বাস্য (আমাদের যুগের দৃষ্টিভঙ্গিতে) কাজও করেছেন। তিনি বলেছেন:
তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দিবে, সেটার বিনিময়েও আল্লাহ তোমাকে সওয়াব দান করবেন (বুখারী)।
আহা এভাবে ভালোবাসতে জানলে, জীবনে আর কিছুর অভাব থাকে?

(বাইশ) স্ত্রীর চাহিদার প্রতিও নবীজির ছিল তীক্ষ্ন  নজর। তিনি বলেছেন:
তুমি যখন খাবার খাবে, স্ত্রীকেও খাওয়াবে। তুমি যখন পরিধান করবে, স্ত্রীকেও পরিধান করাবে (হাকেম)। 
অর্থাৎ তিনি স্ত্রীকে সমমর্যাদা দিয়ে রাখতে বলেছেন। দাসী-বাঁদী করে নয়।

(তেইশ) স্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখা। তাকে সন্দেহ না করা। নবীজি বলেছেন:
কোনও পুরুষ যেন রাতের বেলা না বলে, আচানক ঘরে এসে উপস্থিত না হয়, স্ত্রীর দোষ ধরার উদ্দেশ্যে (মুসলিম)।

(চব্বিশ) স্ত্রীর আবেগ অনুভূতির প্রতিও লক্ষ্য রাখা। নবীজি মিথ্যাকে একদম প্রশয় দেননি। কোনও প্রকার ছাড় দেননি। কিন্তু তিনটা ক্ষেত্রে মিথ্যার ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে একটা হলো:
পুরুষ স্ত্রীকে খুশী করার জন্যে মিথ্যা বললে অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে খুশী করার জন্যে মিথ্যা বললে! (নাসায়ী)।

(পঁচিশ) যার দুইজন স্ত্রী আছে, একজনের প্রতি বাহ্যিক আচরণে যদি বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কেয়ামতের দিন সে একপাশ ঝুঁকে থাকা অবস্থায় কবর থেকে উঠবে! (তিরমিযী)।
স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ করা আবশ্যক।

(ছাব্বিশ) কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকলেও স্ত্রীর খোঁজ-খবর রাখা। শুধু কাজ নিয়েই মজে না থাকা। সারাদিনে একবারও স্ত্রীর খোঁজ না নিয়ে, সুন্নাতের খেলাফ হওয়ার আশংকা আছে। আনাস রা. বলেছেন:
নবীজি রাতে বা দিনে, একবার হলেও স্ত্রীদের খোঁজ-খবর করতেন (বুখারী)

(সাতাশ) মায়মুনা রা. বলেছেন:
নবীজি স্ত্রীরা হায়েয অবস্থায় থাকলেও তাদেরকে আদর করতেন। পায়জামার উপর দিয়ে। নাপাক মনে করে তাদেরকে একেবারে ছেড়ে যেতেন না (বুখারী)।
এখানে শুধু আদরই করতেন, সহবাস নয়।

(আঠাশ) আয়েশা রা. বলেছেন:
একদিন আমি আর তিনি বসে আছি। এমন সময় যয়নব এলো। রাগান্বিতা অবস্থায়। নবীজি আমাকে বললেন:
নাও তার সাথে বিতর্ক করো!
আমি এমন তর্ক করলাম, কিছুক্ষণ পর দেখলাম যয়নবের মুখের লালা শুকিয়ে গেছে। সে আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না। রাসুলুল্লাহর দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি হাসছেন! ব্যাপারটা উপভোগ করছেন (ইবনে মাজা)।

(উনত্রিশ) নবীজি সফরে যাওয়ার সময়, স্ত্রীদের নামে লটারী করতেন। কাকে সাথে নিয়ে যাবেন। লটারীতে যার নাম উঠতো, তাকে সাথে নিয়ে যেতেন (মুত্তাফাক)।
আজ এই সুন্নাত বড়ই অবহেলিত। সবার এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। একটা মরা সুন্নাতকে জীবিত করার সওয়াব কি কম?

(ত্রিশ) স্ত্রীদের সাথে খেলাধূলা করা। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার নবীজি আমাকে বললেন: চলো দৌড় প্রতিযোগিতা করি! আমরা দৌড়ালাম। আমি তার চেয়ে এগিয়ে থেকে দৌড় শেষ করলাম। কিছুদিন পর আমি স্বাস্থ্য একটু ভাল হলে, তিনি আবার একদিন প্রতিযোগিতা দিতে বললেন। এবার তিনি জয়ী হলেন। মুচকি হেসে বললেন:
এটা সেটার বদলা, শোধবোধ। (আবু দাউদ)।

(একত্রিশ) স্ত্রীকে আদর করে অন্য নামে সম্বোধন করাও সুন্নত। আয়েশা রা. বলেছেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ছাড়া আপনার আর সব স্ত্রীদের একটা করে ‘কুনিয়ত’(উপনাম) আছে। তখন নবীজি আমার কুনিয়ত দিলেন: উম্মে আবদুল্লাহ। (আহমাদ)।

(বত্রিশ) স্ত্রীকে গল্প শোনানোও সুন্নাত। নবীজি সুযোগ পেলেই, স্ত্রীদেরকে গল্প শোনাতেন। খুনসুটি করতেন। চমৎকার একটা গল্প বুখারী শরীফে আছে। ‘উম্মে যরা’-এর গল্পটাতো বিখ্যাত।

(তেত্রিশ) ঈদে-উৎসবে স্ত্রীদেরও শরীক করা। তাদেরকে সাথে নিয়ে উপভোগ করা সুন্নাত। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার মসজিদের চত্ত্বরে কিছু হাবশী বালক বর্শা নিয়ে খেলাধূলা করছিল। নবীজি তাদের খেলা দেখছিলেন। আমিও তার পেছনে দাঁড়িয়ে, তার গায়ে হেলান দিয়ে খেলাটা উপভোগ করেছি (বুখারী)।

(চৌত্রিশ) কেউ কষ্ট পায় এমন শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করতেন না। স্ত্রীদের সাথে এবং খাদেমদের সাথেও। আনাস রা. বলেছেন:
আমি দশ বছর নবীজির খেদমত করেছি। একদিনের তরেও তিনি কোনও কাজের জন্যে আমাকে পাকড়াও করে বলেননি: কেন এমনটা করেছো?

(পঁয়ত্রিশ) স্ত্রীদের এবং অন্যদের শখের প্রতি তিনি সম্মান দেখাতেন। অন্যকে খাটো করে দেখতেন না। আয়েশা রা. বলেছেন:
আমি বান্ধবীদের সাথে পুতুল খেলতাম। তিনি ঘরে এলে, বান্ধবীরা ভয় পেয়ে যেতো। তারা লুকিয়ে পড়তো। কিন্তু নবীজি নিজেই সরে গিয়ে, তাদেরকে খেলার সুযোগ করে দিতেন। নিষেধ করতেন না (আদাবুল মুফরাদ)।

(ছত্রিশ) ঘরোয়া পরিবেশকে হাসি-আনন্দপূর্ণ রাখা। নির্দোষ দুষ্টুমি করাও সুন্নাত। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার সাওদা আমার ঘরে বেড়াতে এলেন। নবীজি একপা আমার কোলে, আরেক পা সাওদার কোলে তুলে দিলেন। আমি সাওদার জন্যে ‘হারীরা’ (এক প্রকার খাবার) তৈরী করলাম। তাকে বললাম:
খাও!
আমি খাবো না!
খাও বলছি,নইলে খাবারটা আমি তোমার মুখে মেখে দিবো!
না আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না!
আমি একমুঠ হারীরা উঠিয়ে সাওদার মুখে মেখে দিলাম। এটা দেখে নবীজি মিটিমিটি হাসছিলেন (নাসায়ী)।

(সায়ত্রিশ) একজনকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে না পড়া। পালা থাকলেও, সবার প্রতি দৃষ্টি রাখা। আয়েশা রা. বলেছেন:
খুব দিনই এমন গিয়েছে, নবীজি আমাদের সবার কাছে আসেননি। তিনি প্রায় প্রতিদিনই আসতেন। হাত ধরতেন। সবাইকে অন্তত চুমু হলেও খেতেন। সবার শেষে যেতেন, আজ যার কাছে থাকার পালা, তার ঘরে (তাবাকাতে সা‘দ)।

(আটত্রিশ) স্ত্রীদের সাথে সাময়িক মনোমালিন্য হলেও নবীজি কাউকে খাটো করতেন না। কথাবার্তায় কোমল পন্থা অবলম্বন করতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
ইফকের ঘটনায়, তিনি আমার প্রতি আগের মতো উচ্ছ্বাসিত ছিলেন না। আমি অভিযোগ করলে, তিনি কোমল আচরণ করতেন। কিন্তু আমার কষ্ট লাগতো, আমি সে ঘটনার ভার সইতে না পেরে, অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তিনি এসে আমার আম্মার কাছে জানতে চাইতেন:
সে কেমন আছে?
নাম নিতেন না (বুখারী)।

(উনচল্লিশ) স্ত্রীরা অসুস্থ হলে, নবীজি তাদের সেবা-সুশ্রুষা করতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
আহলে বাইতের কেউ অসুস্থ হলে, তিনি ‘আউযু’ সম্বলিত আয়াতসমূহ পড়ে ফুক দিতেন (মুসলিম)।

(চল্লিশ) নবীজি সা. অন্যদেরকে ভাল স্বামী হতে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করতেন। নিজে একজন ভাল স্বামী হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তো ছিলেনই, তারপরও মৌখিকভাবেও বলতেন:
তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলো, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম বলে বিবেচিত সেই! (তিরমিযী)।

(একচল্লিশ) নবীজি সফর থেকে এসে, চট করে ঘরে চলে যেতেন না। স্ত্রীদেরকে সাজগোজ করার সুযোগ দিতেন। প্রস্তুতি নেয়ার সময় দিতেন। জাবের রা. বলেছেন:
আমরা একবার সফর থেকে মদীনায় ফিরলাম। ঘরে যেতে উদ্যত হলে, নবীজি বললেন:
থামো, স্ত্রীদেরকে সুযোগ দাও। রাতের দিকে ঘরে যেয়ো। স্ত্রীরা এর মধ্যে ‘ক্ষৌরকর্ম’ সেরে নিতে পারবে। আলুলায়িত কেশ বিন্যাস করে নিতে পারবে! (নাসায়ী)।

নবীজি সা.-এর চেয়ে ভাল স্বামী হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব? অন্তত চেষ্টা করতে দোষ কী? তার মতো আমদেরও সব স্ত্রীর প্রতি সমান নজর রাখা অবশ্য কর্তব্য। তাদের অধিকার আদায় করার অপরিহার্য।

Saturday, December 2, 2017

সীরাত পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

সীরাত পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

● হামেদ বিন ফরিদ আহমদ
আধুনিককালে মানুষের শিক্ষা-দীক্ষার নানান চমকপ্রদ দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে এবং তাদের পাঠাভ্যাসও বৃদ্ধি পেয়েছে সমানতালে। মানুষ বই, কিতাব, পত্র-পত্রিকা, ফিল্ম ও অন্যান্য মিডিয়ায় অবগাহন করে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের শিক্ষা-সংস্কৃতি গিলছে গোগ্রাসে। অথচ অধিকতর পাঠাভ্যাস এবং অধ্যয়নযোগ্য করে তুলা উচিত হলো রাসূলে আরাবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত। কেননা, যুগ-যুগান্তর ধরে মানুষ যে জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, মনীষা, মেধা ও মুক্তির সাধনা করে এসেছে, রাসূলে আরাবীতে এসে তা পূর্ণতা পেয়েছে। মানুষের কালান্তরের ন্যায়, সততা, পবিত্রতা, আধ্যাত্মিকা, মনুষ্যত্ব তথা মানবিক গুণাবলীরর সামগ্রিক সাধনা তাঁর মাঝে এসে চূড়ান্ত আকৃতি পেয়েছে। আরবিতে "আল-ইনসানুল কামিল", ইংরেজিতে ঋঁষষ গধহ, বাংলায় পূর্ণ মানব বলে একটি কথা আছে। ধরার বুকে সেই পূর্ণ মানব হওয়ার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি হলেন পেয়ারা নবী, করুণার ছবি রাসূলে আরাবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর সার্বিক জীবনাদর্শ একটি পরিপূর্ণ উম্মতের জীবনাদর্শ। তাঁর গোটা জীবন ইসলামের জীবন্ত ব্যাখ্যা। কাজেই কেবল ধর্মগুরু হিসেবেই নয়, বরং একজন পূর্ণমানব হিসেবেও মুহাম্মদ সাঃ কে অধ্যয়ন করা, তাঁর সীরাত বিষয়ে তথ্যনির্ভর, সহীহ-শুদ্ধ গ্রন্থ পড়ে দেখা সকলের-ই উচিত। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা, নিত্যনৈমিত্তিক পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সকল আপডেট অধ্যয়নে থাকলেও সীরাত অধ্যয়নে উম্মতের অবহেলা ও উদাসীনতা ব্যাপক। সাধারণ লোক শুধু নয়, মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক ব্যতীত অনেক আলেম- উলামারও পেয়ারা নবী সাঃ সম্পর্কে পড়াশোনা অবিশ্বাস্য রকম অল্প। সীরাত পাঠের এই দৈন্যদশা ঘুচিয়ে পাঠকমণ্ডলীকে সীরাতমুখী করার প্রয়াসে নিচে সীরাত অধ্যয়নের কতিপয় গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো।
ক) সীরাত অনুকরণীয় আদর্শ ঃ মানবজীবনের এমন কোন দিক নেই, যা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্পর্শ করেনি। এমন কোন অনুভূতি নেই যা তিনি অনুভব করেন নি। 
কি ব্যবহারিক, কি আধ্যাত্মিক, কি ইহলৌকিক, কি পারলৌকিক সমস্ত কিছুই তাঁর জীবন ও সাধনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ফলে তাঁর জীবনাদর্শ সর্বকালের সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। জীবন পথের আলোর মশাল ও দিকনির্দেশনা স্বরূপ।
(১) নবীয়ে রহমত-৩৫
কুর'আনের প্রায় চল্লিশের অধিকবার নবীজী অনুকরণীয় হওয়ার ঘোষণা বিবৃত হয়েছে। 
(২) মাজমুউল ফাতাওয়া ১/৪ 
আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ "
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে অনুপম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। ( সুরা আহযাব-২১)
এ থেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ ও কার্যাবলী উভয়ই অনুসরণ অনুকরণের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্যতা জানা যায়। আর রাসূলের পরিপূর্ণ, নিখুঁত অনুসরণের জন্যে গভীরভাবে সীরাত অধ্যয়নের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
খ) আমল যাচাইয়ের নিক্তি সীরাতঃ কোন আমল বা কাজ ইসলামি শরীয়তের তুলাদণ্ডে উত্তীর্ণ আর কোন আমলটি ইসলামী আইনে অনুত্তীর্ণ তা যাচাইয়ের নিখুঁত নিক্তি হলো সীরাত। ইসলামের ব্যানারে বর্ণিত, প্রচারিত সকল আমাল-ই রাসূলে আরাবীর সীরাতের নিক্তিতে মেপে দেখতে হয়। যেই আমল রাসূলের এই সীরাত ও সুন্নাতের মানদণ্ডে ঠিকে সেটিই সঠিক আর যেটি ঠিকেনা সেটি অশুদ্ধ, বর্জনীয় বলে বিবেচিত। এক্ষেত্রে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার বক্তব্য উল্লেখযোগ্য, যা খতীবে বোগদাদী রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-জামে লি-আখলাকির রাওয়ী ওয়া আদাবিস সামে' এর মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন, "নিঃসন্দেহে এটা সর্বজন স্বীকৃত বিষয় যে, রাসূল সা. এর সীরাত হলো ইসলামের সকল বিষয়ের সত্যাসত্যের অন্যতম মানদণ্ড। সুতরাং, সকল আমালকে তাঁর জীবনাচার, স্বভাব-চরিত্রের নিক্তিতে মেপে দেখতে হবে। যা কিছু এর সাথে সামঞ্জস্য রাখবে, তাই সত্য। আর যা কিছু সামঞ্জস্য রাখবেনা তা অসত্য।" কাজেই সঠিক ও শুদ্ধ উপায়ে আমল করতে চাইলে সীরাতের পাঠের বিকল্প নেই।
গ) কুর'আন অনুধাবনের সহায়ক সীরাতঃ
জগতের সকল কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ পবিত্র আল-কুর'আন। তিনি ছিলেন সেই কুর'আনের প্রতিবিম্ব। আর তাঁর জীবন ছিল কুর'আনের সর্বশ্রেষ্ঠ তরজমা ও তাফসির। এদিকে ইঙ্গিত করেই হযরত আয়েশা রাজি. বলেছেন, যখন তাঁর কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল রাসূল সাঃ এর সীরাত ও আখলাক সম্পর্কে, তিনি বলেছিলেন" তাঁর আখলাক (সীরাত) ছিল আল-কুর'আন।" অর্থাৎ কুর'আন করীম হলো রাসূল সাঃ এর জীবনচরিতের সংরক্ষিত ও লিখিত নমুনা। আর তাঁর জীবনী হলো কুর'আনের আমলী রূপরেখা। (৩) নবীজীর আদর্শ ও আমাদের জীবন বাস্তবতা-১০) 
কাজেই যে কেউ তাফসীরের কিতাব অধ্যয়ন করতে চায়, তাকে অবশ্যই সীরাত অধ্যয়ন করতে হবে। কারণ, কুর'আনের বহু আয়াত নাযিলের পশ্চাতে এমন প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা সরাসরি রাসূল সাঃ এর সীরাত এর সাথে সম্পর্কিত। সীরাতের জ্ঞান ব্যতিরেকে উক্ত কুর'আনী আয়াতের মর্ম উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এ থেকেও সীরাত পাঠের গুরুত্ব ফুটে উঠে।
ঘ) সীরাত অধ্যয়ন রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃষ্ট প্রমাণ ঃ একজন মুসলমান হিসেবে প্রত্যেক মুসলিমের কাছে-ই প্রাণাধিক প্রিয়পাত্র ও ভালোবাসার পাত্র হওয়া উচিত পেয়ারা নবী সাঃ। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলের এই ভালোবাসাকে আমাদের উপর আবশ্যক করে দিয়ে বলেনঃ " 
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُم من ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার (রাসূল) অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। (সূরা আলে-ইমরান-৩১)
রাসূল সাঃ নিজেই ইরশাদ করেনঃ
‏ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সেই আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষন না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালবাসার পাত্র হই।(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৪)
আর রাসূলের প্রতি ভালোবাসার চারা হৃদয়পটের রোপণ করতে তাঁর সীরাতের গভীর অধ্যয়ন লাগবে। যে যত বেশি সীরাতের গভীরে অবগাহন করবে, সে তত বড় রাসূল প্রেমিকে রূপ নিবে। তার আচার-আচরণ, চলাফেরা সকল কাজে রাসূলের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠবে। কারণ,সীরাত অধ্যয়নে রাসূলের প্রতি মুহব্বত আর ভালোবাসা প্রগাঢ় হয়। 
জীবদ্দশায় রাসূলের কাছে দুনিয়ার বুকে রাসূলকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দকারী ব্যক্তি এসে,তাঁর অনুপম আদর্শ আর নিরুপম চরিত্র মাধুর্যে বিমুগ্ধ হয়ে রাসূলকে প্রাণাধিক প্রিয় হিসেবে গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হত। সুমামাহ ইবনে উবনু উসালের মুখ থেকেই শুনি "হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্‌র কসম! ইতোপূর্বে আমার কাছে যমিনের উপর আপনার চেহারার চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় কোন চেহারা ছিলোনা। কিন্তু এখন আপনার চেহারা-ই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়।" (বোখারী-৪৩৭২, মুসলিম-১৭৬৪) 
অতএব, সীরাতপাঠে রাসূলের ভালোবাসা প্রগাঢ় হওয়ার পাশাপাশি তাঁর সুন্নাহ জীবনে বাস্তবায়ন করে আল্লাহর ইবাদত ও নির্দেশ পালনের পূণ্য হাসিল হয়।
ঙ) সীরাত ঈমান মজবুতির সোনালি সোপানঃ
রাসূল সাঃ ঈমান,ইসলাম প্রচারের পথে কত বাধাবিপত্তি আর ঝড়ঝাপটা সয়েছেন তার সবিস্তার আলোচনা সীরাতে সোনার হরফে লিখা রয়েছে। ফলে সীরাত অধ্যয়নে রাসূলের এসব বিপদ-মুসিবত সহ্য করার ঘটনাবলি পড়ার মাধ্যমে ঈমান আরো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য হয়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ" 
أَمْ لَمْ يَعْرِفُوا رَسُولَهُمْ فَهُمْ لَهُ مُنْكِرُونَ
নাকি তারা তাদের রাসূলকে চিনতে পারেনি, ফলে তারা তাকে অস্বীকার করছে? (সূরা মুমিনুন-৬৯)
বলা চলে, সীরাত অধ্যয়ন অমুসলিমকে ইসলামের প্রতি প্রলুব্ধ করে আর মুসলিমের ঈমানের মাঝে মজবুতি আনে। তাই দেখা যায়, সহস্র অমুসলিম সীরাতে রাসূল অধ্যয়ন করতে, নিজেকে নবীজীর সীরাতের মাঝে সমর্পণ করে দিয়েছেন। এই অর্থে ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেন,
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، سَأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ فَأَتَى قَوْمَهُ فَقَالَ أَىْ قَوْمِ أَسْلِمُوا فَوَاللَّهِ إِنَّ مُحَمَّدًا لَيُعْطِي عَطَاءً مَا يَخَافُ الْفَقْرَ ‏.‏ فَقَالَ أَنَسٌ إِنْ كَانَ الرَّجُلُ لَيُسْلِمُ مَا يُرِيدُ إِلاَّ الدُّنْيَا فَمَا يُسْلِمُ حَتَّى يَكُونَ الإِسْلاَمُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক লোক রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে দু’ পাহাড়ের মাঝামাঝি ছাগলগুলো চাইলে তিনি তাকে তা দিয়ে দিলেন। অতঃপর সে লোক তার গোত্রের নিকট প্রত্যাবর্তন শেষে বলল, হে আমার জাতি ভাইয়েরা! তোমরা ইসলাম কবূল কর। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভাবের আশঙ্কা না করে দান করেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, যদিও মানুষ শুধু ইহকালের উদ্দেশ্যেই ইসলাম গ্রহণ করে তবুও ইসলাম গ্রহণ করতে না করতেই ইসলাম তার কাছে পৃথিবী এবং পৃথিবীর সকল প্রাচুর্যের চাইতে অধিকতর প্রিয় হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৫৯১৫)
চ) সীরাত সৌভাগ্যের জিয়নকাঠিঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত মানবজীবনের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। সীরাত অনুসরণ- অনুকরণ এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বাস্তবায়ন ছাড়া কারো পক্ষেই পার্থিব কিংবা অপার্থিব কোন সফলতার আশা করা বোকামি। ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেনঃ "যেহেতু দুনিয়া-আখেরাতের একমাত্র সফলতা আর সকল সৌভাগ্য রাসূলের পদাঙ্ক অনুসরণের মাঝেই নিহিত। কাজেই প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির উচিত যে নিজের জীবনে কল্যাণ, সফলতা আর সৌভাগ্য কামনা করে, সে যেন নবীজীর সীরাত অধ্যয়ন করে। এতে করে সে রাসূলকে চিনতে পারবে। রাসূলের সত্যিকার অনুসারী হতে পারবে। " যাদুল মা'আদ-১/৩৬)
এভাবে ক্রমান্বয়ে সীরাত পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরতে গেলে শত পৃষ্ঠার বৃহদাকার গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। তবে এত দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা না এনে পাঠকবর্গের নিকট অধমের কামনা থাকবে, উম্মত হিসেবে ভালোবাসার দাবি থেকে হলেও প্রত্যেকের ঘরে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন চরিতের একটি করে কপি যেন স্থান পায়। এবং তা পঠিতও হয়। আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের রাসূলের সাচ্চা আশেক হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

শামায়েলে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ( পর্ব-১)

শামায়েলে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ( পর্ব-১)

● মুহাম্মাদ হারূন আযীযী নদভী
‘শামায়েল’ বলতে ব্যক্তিগত আকার-আকৃতি, আচার-আচরণ ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। যা মানুষের পূর্ণাঙ্গ চরিত্র বা সীরাতের একটি অংশ মাত্র।
রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) এর ‘সীরাত’ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, সীরাত অধ্যয়ন করা, চর্চা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সকল মুসলিম নর-নারীর ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ্‌ তা’আলা ইরশাদ করেছেন,
كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا  ٣٣:٢١
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। [ সুরা আহযাব ৩৩:২১ ]
‘সীরাতে রাসুলুল্লাহ’ বিষয়টি অনেক ব্যাপক, এর অনেক দিক রয়েছে। সর্বদিক আলোচনা করে শেষ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সীরাত বিষয়ে অনেক লেখালেখি, বয়ান-বক্তৃতা, সভা-সমিতি, সেমিনার-সম্মেলন হয়েছে। এতকিছুর পরেও একথা বলা যায় না যে, সীরাতের ব্যাপারে লেখা-লেখি এবং প্রকাশ-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। না কখনো না, বরং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সীরাতের বিভিন্ন দিক তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। সুন্দরের চেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হচ্ছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশা-আল্লাহ।
প্রসিদ্ধ সীরাত গবেষক শ্রদ্ধেয় উস্তাদ আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র‘হিমাহুল্লাহ স্বীয় অনন্য সীরাত গ্রন্থ ‘আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ’-র ভূমিকায় বলেছেন,
“মহানবী (সাঃ) এর জীবনী অন্য নবী-রাসূল ও মহা-মনীষীদের জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর এ অকল্পনীয় ব্যাপকতা, জটিলতা ও খুঁটিনাটি বিষয়ের এ সুবিস্তারিত বর্ণনায় তার আখলাক ও চরিত্রের অপূর্ব বিবরণ পাওয়া যায়।”
সীরাত ও শামায়েল গ্রন্থসমূহ যা কিছু সংকলন ও সংরক্ষণ করে আমাদের দিয়েছে (সীরাত ও শামায়েল লেখকদের যাবতীয় প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিনয়ের সাথে বলতে হয়) এটা তার সুবিশাল সীরাতের অপরূপ শোভা-সৌন্দর্যের ও সুমহান নবুওয়াতের যে পরিপূর্ণতা দিয়ে আল্লাহ্‌ পাক তাকে মহিমান্বিত করেছিলেন, তার এক সামান্য ঝলকমাত্র। [সূত্র: ১]
সীরাতুন্নবীর বিশেষ একটি অংশ হল শামায়েলে নববী। অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর শারীরিক আকার আকৃতি, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, শয়ন-জাগরণ, খানা-পিনা, লেন-দেন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, মানুষের সাথে মেলা-মেশা, ইবাদত-বন্দেগী, যিকর-আযকার এবং দো’আ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে তার আদত-অভ্যাস সম্পর্কে সম্যক আলোচনা। সীরাত ও শামায়েল সম্পর্কে জানার জন্য পবিত্র কুরআন মাজীদের বাস্তব রূপই হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র মাধুর্য তথা পবিত্র সীরাত। উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ)-কে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন,
‘তার চরিত্র-মাধুর্য ছিল পবিত্র কুরআন মাজীদ’। [সূত্র: ২] 
সীরাত-শামায়েলের কোন একটি অংশও কোন রকমের মনগড়া বর্ণনা বা বানোয়াট কল্প কাহিনীর মুখাপেক্ষী নয়। আল্লামা নদভী (রঃ) বলেছেন,
‘মহানবী (সাঃ) এর সীরাত রচনা করতে কোন প্রকার কিয়াস-অনুমান ও মনগড়া সব নিয়ম-নীতির অনুসরণ ও এর উপর নির্ভর করার আদৌ প্রয়োজন নেই, যার প্রয়োজন পৃথিবীর মহা-মনীষীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। কারণ মহানবী (সাঃ) এর জীবনী আর সব মনীষীর জীবনীর চেয়ে পরিপূর্ণ, ঐশ্বর্যময় ও অপরূপ শোভামণ্ডিত। উৎসমূল কুরআন পাকের তাবৎ সুস্পষ্ট বর্ণনা, ইতিহাসের অনস্বীকার্য সাক্ষ্য, তার আখলাক-চরিত্রের খুঁটি-নাটি বিষয়ের সুবিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান, যার অধিক কল্পনা করা যায় না’। [সূত্র: ৩] 
তিক্ত হলেও সত্য যে, হাদীছে রাসুলের অন্যান্য বিষয়ে যেমন কুমতলবীরা অনেক মনগড়া কল্পকাহিনী ও বানোয়াট কথা-বার্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে, তদ্রুপ সীরাত-শামায়েলের ব্যাপারেও অনেক জাল-মওযু কথা-বার্তা লোকালয়ে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলি যাচাই-বাছাই করে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর ছহীহ-শুদ্ধ সীরাত সংরক্ষণ করা এবং নির্ভেজালভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সময়ের সুমহান দাবী এবং বিজ্ঞ আলেম-ওলামার গুরুদায়িত্ব। আমি এখানে সীরাতের বিশেষ একটি দিক ‘শামায়েলে নববী’ সম্পর্কে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে কিছু আলোকপাত করতে চাই।

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ
১. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নিজের বংশ পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহ্‌ তা’আলা ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর থেকে কিনানা গুত্রকে বাছাই করেন, কিনানা গুত্র থেকে কুরাইশকে বাছাই করেন এবং বনূ হাশিম থেকে আমাকে বাছাই করেন। [সূত্র: ৪]
২. হুনাইন যদ্ধ প্রসঙ্গে বর্ণিত এক হাদীছে হযরত বারা বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি নবী, কোন মিথ্যুক নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান’। [সূত্র: ৫]
৩. আব্দুল-মুত্তালিব ইবনে আবু ওয়াদাআহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহ এর সন্তান। আল্লাহ্‌ তা’আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যে উত্তমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তিনি তার সৃষ্টিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার উত্তম দল থেকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কতক গোত্রে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার উত্তম গোত্র থেকে পয়দা করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কতক পরিবারে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার সবচেয়ে উত্তম পরিবারে পয়দা করেছেন। অতএব, আমি ব্যক্তি সত্তায় তোমাদের চেয়ে উত্তম এবং বংশ মর্যাদায় সবার চাইতে উত্তম’। [সূত্র: ৬]
৪. মুহাম্মাদ ইবনু আলী থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্‌ পাক আমাকে বিবাহ থেকে সৃষ্টি করেছেন, যেনা-ব্যভিচার থেকে নয়’। [সূত্র: ৭]
৫. হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি বিবাহের মাধ্যমে পয়দা হয়েছি, যেনা-ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়। জাহেলী যুগের ব্যভিচার আমাকে কোন সম্পর্ক করেনি’। [সূত্র: ৮]
৬. হযরত আবু মাসউদ বদরী ও জাবীর ইবনু আব্দিল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে এসে কথা বলছিল, তখন সে ভয়ে কাঁপছিল, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তুমি স্থির হও (ভয় কর না) আমি কোন সম্রাট নই, আমি কুরাইশ বংশীয় এক মহিলার সন্তান, যে শুকনো গোসত খেত’। [সূত্র: ৯]
৭. কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) এর তিনজন দাদী ছিলেন, সবার নাম ছিল ‘আতেকা’। যখন গর্ব করে কিছু বলতেন তখন বলতেন, আমি ‘আতেকা’ সমূহের সন্তান। [সূত্র: ১০]
৮. হযরত খালেদ ইবনে মা’দান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আমার পিতা ইবরাহীম (আঃ) এর দো’আ, ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। যখন সে আমাকে গর্ভ ধারণ করেছিল, ‘তখন সে দেখেছে যে তার থেকে একটি আলো বের হল, যা সিরিয়া দেশের প্রাসাদগুলিকে আলোকিত করেছে’। [সূত্র: ১১]
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছহীহ বর্ণনা মতে রবী’উল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ সোমবার হস্তিবাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে তার কয়েকটি বক্তব্য পেশ করা হলঃ
৯. আবু কাতাদা (রাঃ) বলেন, এক বেদুইন এসে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! সোমবার ছিয়াম সম্পর্কে আপনার কি মত? উত্তরে তিনি বললেন, ‘সোমবার হল সেই দিন, যে দিনে আমি পয়দা হয়েছি এবং আমার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’। [সূত্র: ১২]
১০. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হস্তি বাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেছেন’। [সূত্র: ১৩]
১১. কায়স ইবনে মাখরামা (রাঃ) বলেন, ‘আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হস্তি বাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেছি’। [সূত্র: ১৪]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহঃ
কুরআন-হাদীছ পর্যালোচনা করলে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর অনেক নামের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এগুলির নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা কোন ছহীহ হাদীছে পাওয়া যায় না। একটি ছহীহ হাদীছে পাঁচ নামের কথা বর্ণিত থাকলেও অন্য এক বর্ণনায় পাঁচের অধিক নামের সন্ধান পাওয়া যায়। ইমাম নববী (রঃ) আবূবকর ইবনুল আরাবী আল-মালেকীর বরাত দিয়ে বলেন যে,
‘আল্লাহ্  তা‘আলার এক হাজার নাম রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-রও এক হাজার নাম রয়েছে। ইবনুল আরাবী অন্তত ৬৩টি নাম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন’। [সূত্র: ১৫]
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেন, ‘মুহাদ্দিছ ইবনে দেহয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহ সম্পর্কে রচিত তার কিতাবে বলেছেন, কেউ কেউ মনে করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নামও আল্লাহ্‌ পাকের আসমায়ে হুসনার ন্যায় ৯৯টি। কেউ রিসার্চ করলে তা তিন শত পর্যন্ত পৌঁছবে’। [সূত্র: ১৬] কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহ সম্পর্কে ৯৯ অথবা তিনশত অথবা এক হাজার সংখ্যার উল্লেখ কোন ছহীহ হাদীছে দেখিনি। এ জন্যই মনে হয় কোন কোন আলেম নবীর ৯৯ নামের কথাটিকে বিদ’আতী উক্তি আখ্যা দিয়েছেন। ইয়েমেনের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ আল্লামা মুকবিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেয়ী বলেন,
‘কুরআন মাজীদের বিভিন্ন কপিতে যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নামের সংখ্যার গণনা ৯৯ পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে তা বিদ’আতী উক্তি’। [সূত্র: ১৭] তবে এটা সত্য যে, সব নাম না হলেও বেশ কিছু নামের উৎস কুরআন মাজীদের আয়াত এবং কোন কোন ছহীহ হাদীছে ইশারা-ইঙ্গিতে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। বিস্তারিত গবেষণা করে এগুলি বের করতে হলে, এই বিষয়ে বড় ধরনের একটি বই রচনা করতে হবে। এখানে ছহীহ-শুদ্ধ হাদীছের আলোকে কয়েকটি নামের উল্লেখ করা হল:
১. হযরত যুবাইর ইবনে মুতঈম (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ ও আহমাদ। আমি আলমাহী, আমার দ্বারা আল্লাহ্‌ পাক কুফরকে নিশ্চিহ্ন করেন। আমি আল-হাশির, কিয়ামতের দিন আমার পশ্চাতে মানব জাতিকে সমবেত করা হবে এবং আমি আল-আকিব (শেষ আগমনকারী), আমার পর আর কোন নবী আসবে না’। [সূত্র: ১৮]
২. হযরত যুবাইর ইবনে মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আহমাদ, হাশির, আকিব, মাহী এবং খাতম’। [সূত্র: ১৯]
৩. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কাছে অনেক নাম উল্লেখ করেছেন, বলেছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আহমাদ, মুকাফফী, হাশির, নবীয়্যুত তওবা এবং নবীয়্যুর রহমাহ’। অন্য বর্ণনায় আছে ‘নবীয়্যুল মালহামাহ’। [সূত্র: ২০]
৪. হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি মদীনার রাস্তা অতিক্রম করছিলাম হঠাৎ শুনতে পেলাম যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, নবীয়্যুর রহমাহ, নবীয়্যুত তওবাহ, হাশির, মুকাফফী, নবীয়্যুল মালাহিম’। [সূত্র: ২১]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উপনামঃ
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রসিদ্ধ উপনামসমূ হল আবুল কাসিম। কোন কোন বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, পরে তাকে আবূ ইবরাহীমও বলা হতো।
১. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বাজারে ছিলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আবুল কাসেম! নবী (সাঃ) সেদিকে তাকালেন (এবং বুঝতে পারলেন লোকটি অন্য কাউকে ডাকছে), অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা আমার নামে নাম রাখো, উপনাম ধরে আমাকে ডেকো না। [সূত্র: ২২]
২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আবুল কাসেম। আল্লাহ্‌ দান করেন আর আমি বণ্টন করে থাকি’। [সূত্র: ২৩]
৩. আনাস (রাঃ) বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রনণ করলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) এসে বললেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা ইবরাহীম’। [সূত্র: ২৪]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর শারীরিক গঠন ও আকৃতিঃ
১. হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট দীর্ঘকায়ও ছিলেন না, আর খর্বকায়ও ছিলেন না। ধবধবে শুভ্র বর্ণও ছিলেন না, আর বাদামীও ছিলেন না। অত্যধিক কুঞ্চিত কেশবিশিষ্টও ছিলেন না। তার বয়স যখন চল্লিশ বছর হয়, তখন আল্লাহ্‌ পাক তাকে নবুওয়াত প্রদান করেন, অতঃপর মক্কায় দশ বছর এবং মদীনাতে দশ বছর অবস্থান করেন। তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে ওফাৎ দেন। ওফাৎকালে তার মাথায় এবং দাড়িতে বিশটি চুলও সাদা হয়নি’। [সূত্র: ২৫]
২. হযরত আনাস (রাঃ) আরও বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন মধ্যম উচ্চতা-বিশিষ্ট, না দীর্ঘ আর না বেঁটে। সুন্দর ছিল তার শারীরিক গঠন। আর তার চুল অত্যধিক কুঞ্চিতও ছিল না এবং একেবারে সটান সোজাও ছিল না। তিনি গৌরবর্ণ ছিলেন। পথে হাঁটার সময় তিনি সম্মুখে ঝুঁকে দ্রুত চলতেন’। [সূত্র: ২৬]
৩. হযরত বারা ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) মধ্যম আকৃতির লম্বা ছিলেন। তার দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান বেশ প্রশস্থ ছিল। [সূত্র: ২৭]
৪. হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাঃ) লম্বাও ছিলেন না, আবার একেবারে বেঁটেও ছিলেন না। হাতের তালুদ্বয় ও পদতলদ্বয় এবং আঙ্গুলগুলি মাংসল ছিল। মস্তক বৃহৎ এবং অস্থিগ্রস্থগুলি মোটা ছিল। লোমের একটি সরু রেখা বক্ষ থেকে নাভি পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। পথ চলা কালে এমনভাবে সম্মুখে ঝুঁকে দ্রুত হাঁটতেন যেন কোন নিম্নস্থানে নামছেন। তার অনুরূপ কাউকেও আমি তার পূর্বে দেখিনি, তার পরেও দেখিনি, আল্লাহ্‌ পাক তার উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন’। [সূত্র: ২৮]

(চলবে ইনশা-আল্লাহ…)
——————————————————————
তথ্যসূত্র:
* খতীব, আলী মসজিদ, বাহরাইন।
১. আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ-র ভূমিকা, পৃঃ ১৬,১৭; নবীয়ে রহমত, পৃঃ ২৩ ।
২. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/৪৮১১ ।
৩. আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, পৃঃ ১৬; নবীয়ে রহমত, পৃঃ ২৩ ।
৪. মুসলিম হা/২২৭৬; তিরমিযী হা/৩৬০৬; মুসনাদ আহমাদ ৪/১০৭ পৃঃ, হা/১৭১১১ ।
৫. বুখারী হা/২৯৩০; মুসলিম হা/১৭৭৬ ।
৬. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/১৪৭২; মিশকাত, তাহকীক আলবানী হা/৫৭৫৭ ।
৭. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/১৭০৩; আল-সুনানুল কুবরা ৭/১৯০ পৃঃ হা/১৪০৭৬ ।
৮. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর, হা/৩২২৫; আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনে কাছীর, তাহকীকঃ আলবানী পৃঃ ১০; ইরওয়াউল গালীল হা/১৯১৪ ।
৯. সুনান ইবনু মাজাহ হা/৩৩১২; মুস্তাদরাক হাকেম ২/৫৪৮ পৃঃ হা/৩৭৯০; সিলসিলা ছহীহা হা/১৮৭৬ ।
১০. বায়হাকী তাবরানী, ইবনু আসাকির, সিলসিলাহ ছহীহা, হা/১৫৬৯, ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর, হা/১৪৪৬ ।
১১. সিলসিলা ছহীহা, হা/১৫৪৫; মুস্তাদরাক ২/৭০৫ পৃঃ, হা/৪২৩৩ ।
১২. মুসলিম হা/১১৬২, মুস্তাদরাক হাকেম ২/৭০৭ পৃঃ, হা/৪২৩৮ ।
১৩. মুস্তাদরাক ২/৭০৭ পৃঃ হা/৪২৩৯, ইবনে কাছীর, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, পৃঃ ১৩।
১৪. মুস্তাদরাক ২/৭০৮ পৃঃ, হা/৪২৪২, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ পৃঃ ১৩।
১৫. শরহ মুসলিম ১৫/১০৪ পৃঃ ।
১৬. হাফেয ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৬/৬৮২ পৃঃ ।
১৭.আল-জামিউছ ছাহীহ ৩/৩৭১ পৃঃ ।
১৮. বুখারী, কিতাবুল মানাক্বিব হা/৩৫৩২; কিতাবুত তাফসীর হা/৪৮৯৬; মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল হা/২৩৫৪; তিরমিযী, কিতাবুল আদব হা/২৮৪০; সহীহ আল-বুখারী আরবী-বাংলা; ৩/৪৩৬ পৃ:, হা/৩২৬৮।
১৯. মুসনাদে আহমাদ ৪/৮১. ৮৪ পৃ:, হা/১৬৮৬৯, ১৬৮৯২।
২০. মুসলিম হা/২৩৫৫; মুসনাদে আহমাদ ৪/৪০৪ পৃ:, হা/১৯৮৫০, ৪/৩৯৫ পৃ:, হা/১৯৭৫৪; মুস্তাদরাক-হাকেম ২/৭০৯ পৃ: হা/৪২৪৪।
২১. মুসনাদে আহমাদ ৫/৪০৫ পৃ: হা/২৩৮৩৮, আল-জামিউস সহীহ, শায়খ মুকবিল ইবনে হাদী আর-ওয়াদেয়ী ৩/৩৭১ পৃ: ইবনু হিব্বান, হা/৬৩২৪।
২২. বুখারী হা/৩৫৩৭; মুসলিম হা/২১৩১।
২৩. মুস্তাদরাক ২/৭০৯ পৃ: হা/৪২৪৬, সহীহুল জামিউস সাগীর হা/১৪৪৭।
২৪. মুস্তাদরাক হাকেম ২/৭১০ পৃ:, হা/৪২৪৭।
২৫. বুখারী হা/৩৫৪৮; মুসলিম হা/২৩৩৭; শামায়েলে তিরমিযী, তাহক্বীক: শায়খ আলবানী, পৃ: ১৩, হা/১।
২৬. বুখারী, হা/৩৫৪৭, মুসলিম হা/২৩৪৭, শামায়েলে তিরমিযী, পৃ: ১৪।
২৭. বুখারী, হা/৩৫৫১, মুসলিম, হা/২৩৩৭।
২৮. তিরমিযী, হা/৩৬৪১; মুস্তাদরাক ২/৬০৬ পৃ: মুসনাদে আহমাদ ১/৯৬ পৃ: হা/৭৪৬; শামায়েলে তিরমিযী, পৃ: ১৫, হা/৪।