নোটিশ
আপনি কি ব্লগ কিংবা ফেসবুকে ইসলাম এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে আগ্রহী?
তাহলে আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ দিন। ধন্যবাদ
Showing posts with label সুন্নত. Show all posts
Showing posts with label সুন্নত. Show all posts

Tuesday, January 2, 2018

রোগীর সেবাশুশ্রূষা উত্তম ইবাদত:

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব
পাড়া-প্রতিবেশী , আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে , তাকে দেখতে যাওয়া ও তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা মুস্তাহাব । যদি রুগ্ণ ব্যক্তির দেখাশোনা করার মতো তার কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকে , তাহলে সর্বসাধারণের মধ্যে তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের ওপর তার সেবাশুশ্রূষা করা ফরজে কেফায়া ।

রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন , এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের হক পাঁচটি- সালামের জবাব দেয়া , রোগীকে দেখতে যাওয়া , জানাজায় শরিক হওয়া ,

দাওয়াত কবুল করা , হাঁচির জবাব দেয়া । ( বুখারি , মুসলিম ও মিশকাত শরিফ : হাদিস নম্বর ১৫২৪) । 

হজরত বারা ইবনে আজিব রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন- প্রথম , রোগীর শুশ্রূষা করা ; দ্বিতীয় , জানাজার পশ্চাতে চলা। তৃতীয়, হাঁচিদাতার জবাবে

‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা ; চতুর্থ, দুর্বল মানুষের সাহায্য করা । পঞ্চম , নিপীড়িত ব্যক্তিদের সাহায্য করা ; ষষ্ঠ , সালামের প্রচার-প্রসার ঘটানো ; সপ্তম , কসমকারীর কসমকে পুরা করতে সাহায্য করা । ( বুখারি শরিফ ৭/১১৩ : হাদিস নম্বর ৫৬৩৫) ।

সর্বপ্রথম রাসূল সা: যা বলেছেন তা হচ্ছে ,
রোগীর সেবাযত œ করা । অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করা । রাসূলুল্লাহ সা: নিজেও রোগীর সেবাশুশ্রূষা করতেন।

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: এক অসুস্থ ইহুদি গোলামকে দেখতে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ।

এই আমলটি সাধারণত আমরা সবাই করি ।

তবে বর্তমানে রোগীর সেবাশুশ্রূষা শুধু একটি প্রচলন হয়ে গেছে । আমরা অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রূষা করতে যাই লোকলজ্জার ভয়ে । লোকলজ্জার মানসিক চাপ নিয়ে রোগীর শুশ্রূষা করলে আখেরাতের নেক সাওয়াবের আশা করা যায় না। সাওয়াব লাভ করার জন্য ইখলাস বা আন্তরিকতা ও আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা থাকা জরুরি । এক হাদিসে কুদসিতে বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় উল্লেখিত হয়েছে। হাদিসটি এই-

‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন,
হে আমার বান্দা! আমি তোমার প্রভু। আমি অসুস্থ ছিলাম , তুমি আমাকে দেখতে আসনি । বান্দা বলবে , হে প্রভু! আপনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আমি কিভাবে আপনাকে দেখতে যেতে পারি ? আল্লাহ তায়ালা বলবেন , তুমি কি জানতে না যে ,

আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল ? যদি তুমি তাকে দেখতে যেতে তাহলে তুমি সেখানে আমাকে পেতে। আল্লাহ তায়ালা আবার হে আমার বান্দা! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম , কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি । বান্দা বলবে , ইয়া রব! আমি আপনাকে কিভাবে খাবার দিতে পারি ?
আপনি হলেন সারা জাহানের পালনকর্তা ।

আল্লাহ তায়ালা বলবেন , আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাওনি । যদি তুমি তাকে খাবার দিতে তাহলে আজ আমাকে কাছে পেতে । পুনরায় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম , তুমি আমাকে পানি দাওনি ।

বান্দা আগের মতোই উত্তর দেবে । আল্লাহ তায়ালা বলবেন , তোমার কি স্মরণ আছে ,
আমার এক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল; কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি ? তুমি কি জানো , তুমি যদি সেদিন তাকে পানি দিতে তাহলে তার প্রতিদানে আজ আমাকে কাছে পেতে । ’ ( বুখারি শরিফ : রোগীর সেবা করার ফজিলত , রিয়াদুস সালেহিন) । 

অসুস্থকে দেখতে যাওয়া ,
ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো ,
পিপাসার্তকে পানি পান করানো- এগুলো হলো মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যম । সহানুভূতি এমন এক মহৎ গুণ, যার কারণে মানুষ আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারে ।

আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন , ‘ কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তির সেবাশুশ্রূষা করলে , যতটুকু সময় ধরে সেবা করে ততটুকু সময় সে ধারাবাহিকভাবে জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে প্রত্যাবর্তন না করে। ’ ( সহি মুসলিম , কিতাবুল বির ওয়াস সেলাহ) ।

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘ কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তিকে সকালে সেবাশুশ্রূষা করলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে । সন্ধ্যায় সেবাশুশ্রূষা করলে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান নির্দিষ্ট করেন । ’

এটা কোনো সাধারণ প্রতিদান নয় । মাত্র একটু মেহনতের দ্বারা মেহেরবান খোদা আমাদের কী পরিমাণ সাওয়াব দান করছেন! তার পরও কি আমরা এই চিন্তা করব যে , অমুকে তো আমি অসুস্থ হওয়ার পর আমাকে দেখতে আসিনি । আমি কেন তাকে দেখতে যাবো ? এজাতীয় চিন্তা দ্বারা যে আমার নিজের আখেরাত ধ্বংস হচ্ছে , আশা করি তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই । অমুক যদি সাওয়াব অর্জন না করেন ,

তার যদি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়ার দরকার না হয় , সে যদি জান্নাতের বাগিচা অর্জন করতে না চায় তাহলে আমিও কি তা অর্জন করব না ? আমি কি অমুকের সাথে হিংসা করে আমার আখেরাত নষ্ট করব ?

আমি কি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়া থেকে বঞ্চিত হব? আমার কি জান্নাতের বাগিচার দরকার নেই ?
যদি রোগীর পক্ষ থেকে আমি কষ্ট পেয়ে থাকি অথবা তার সাথে আমার আন্তরিকতা না থাকে , তার পরও তার সেবাযতেœ র জন্য আমার যাওয়া উচিত । এতে দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী হব ইনশাআল্লাহ ।

একটি হচ্ছে রোগীর সেবাশুশ্রূষা করার সাওয়াব । অপরটি হচ্ছে এ রকম মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সাওয়াব ,

যার ব্যাপারে আমার অন্তরে সঙ্কোচ রয়েছে। এ সঙ্কোচ ও লজ্জা থাকা সত্ত্বেও তার সাথে বন্ধুত্বসুলভ সহমর্মিতার আচরণ করার ওপর পৃথক প্রতিদান পাবো ইনশাআল্লাহ । সুতরাং রোগীর সেবাশুশ্রূষা ও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া কোনো মামুলি বিষয় নয় । তাই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে শুধু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য রোগীর সেবাশুশ্রূষা করলে ইনশাআল্লাহ অগাধ প্রতিদান পাওয়া যাবে ।

রোগী দেখতে যাওয়ার আদব :
১. সাক্ষাতের সাধারণ আদবগুলো মেনে চলা। যেমন- হালকা শব্দে দরজা নক করা ।
অনুমতি নেয়ার সময় দরজার সামনে না দাঁড়ানো। নিজের স্পষ্ট পরিচয় দেয়া ।
চক্ষুকে অবনত রাখা ইত্যাদি।

২. সাক্ষাতের জন্য উপযুক্ত সময় নির্বাচন করা । খাবারের সময় , বিশ্রামের সময়, ঘুমের সময়, ইবাদতের সময় সাক্ষাৎ করতে না যাওয়া ।

৩. রোগীর মাথার কাছে বসা । তার কপালে হাত দেয়া । তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা ।

৪. বারবার সাক্ষাতের জন্য না যাওয়া ।
এতে রোগীর কষ্ট হতে পারে । তবে রোগীর অবস্থা দ্বারা যদি বোঝা যায়,
সাক্ষাৎপ্রার্র্থীর বারবার সাক্ষাতে রোগী তৃপ্তি পায় বা আগ্রহী হয় বা রোগ-যন্ত্রণা কিছুটা হ্রাস পায় , তাহলে বারবার যাওয়া যেতে পারে ।

৫. রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা । এতে রোগীর নিজের বা পরিবারের লোকদের বিরক্তির কারণ হতে পারে বা তাদের কোনো নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে ।

৬. রোগীকে বেশি প্রশ্ন না করা । কেননা অসুস্থাবস্থায় বেশি বেশি প্রশ্ন রোগীর জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৭. রোগীর সুস্থতার জন্য দোয়া করা । তার কাছে বসে সূরা নাস, ফালাক ও সূরা ইখলাস পাঠ করা । আরো অনেক দোয়া বর্ণিত আছে । যেমন- আসআলুল্লাহাল আজিম রব্বাল আরশিল আজিম আন ইয়াশফিয়াক । ’ ( সাত বার) ।

৮. অসুস্থ ব্যক্তির সামনে এমন কিছু না বলা ,
যা তাকে চিন্তিত করে তোলে । বরং তাকে সান্ত্বনার বাণী শুনাতে হবে । তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে হবে ।

রোগীকে সান্ত্বনা প্রদান করা নেকির কাজ । রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন , ‘ যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইকে বিপদে সান্ত্বনা দেবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন । ( ইবনে মাজাহ : হাদিস নম্বর ১৬০১ ,

সনদ হাসান , ইরওয়াউল গালিল : হাদিস নম্বর ৭৬৪) । তাকে সাহস দিতে হবে । ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ দিতে হবে । সম্ভব হলে ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কে কিছু শোনাতে হবে । এমন কথা বলতে হবে যাতে তার মনোবল শক্তিশালী হয় ।

৯. অসুস্থ ব্যক্তির কাছে নিজের জন্য দোয়া চাইতে হবে। কেননা এটি সুন্নত।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজিপুর।
সম্পাদক, মাসিক আল হেরা।

Sunday, December 24, 2017

দৈনন্দি জীবনে সুন্নাহ্‌র অনুস্মরণঃ

১. কোন কিছু আরম্ভ করার পূর্বে-বিসমিল্লা-হ,
২. কোন কিছু করার উদ্দেশ্য-‘ইনশা আল্ল-হ’।
৩. কোন বিস্ময়কর বিষয় দেখলে-‘সুব‘হা-নাল্ল-হ’।
৪. কষ্টে ও যন্ত্রণায়-‘ইয়া- আল্ল-হ’।
৫. প্রশংসার বহিঃপ্রকাশে-‘মা-শা-আল্ল-হ’।
৬. ধন্যবাদ জ্ঞাপনে-‘জাঝাকাল্ল-হু খাইরা’।
৭. ঘুমানোর সময়-‘বিসমিল্লা-হি আল্ল-হুম্মা বিসমিকা আমূতু ওয়া আ‘হইয়া’ পড়া এবং ডান কাত হয়ে ঘুমানো।
৮. ঘুমানোর পূর্বে- ‘সুরাহ মূল্‌ক্’ পড়া।
৯. ঘুম থেকে জাগ্রত হবার পর-‘আল-‘হামদু লিল্লা-হিল্লাযী আ‘হইয়া-না বা‘দা মা- আমা-তানা- ওয়া ইলাইহিন্নুশূর’।
১০.খানার পূর্বে- ‘দুনো হাত তিনবার ধুয়া এবং একটি কুলি করা’।
১১.খানার শুরুতে-‘বিসমিল্লা-হ’।
১২.খানার মাঝে মাঝে-‘লাকাল ‘হামদু ওয়া লাকাশ্‌ শুক্‌র’।
১৩.খানার শেষে-আল‘হামদু লিল্লা-হিল্লাযী আত্ব‘আমানা- ওয়া ছাক্ব-না- ওয়া জা‘আলানা মিনাল মুসলিমীন,
১৪. কোথাও দা’ওয়াতে খানার শেষে-‘আল্লাহুম্মা আত‘ইম্মান আত্‘আমানী ওয়াসক্বি মান সাক্বানী ওয়াজা‘আলানী মিনাল মুসলিমীন’।
১৫.শৌচাগারে প্রবেশের সময়-‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদ্বলিক’ বলা এবং বাম পায়ে প্রবেশ করা।
১৬.শৌচাগার থেকে বের হতে ডান পায়ে বের হওয়া এবং ‘গুফরানাক’ পড়া।
১৭.ওযুর সময় ‘বিস্‌মিল্লাহ’।
১৮.ওযুর শেষে ‘আশহাদু আনঁলা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া‘হদাহূ লা শারীকা লাহূ ওয়া আশহাদু আন্না ছাইয়াদান মু‘হাম্মাদান ‘আবদুহূ ওয়া রসূলুহ, আল্লাহুম্মাজ‘আলনী মিনাত তাওয়াবীনা ওয়াজ‘আলনী মিনাল মুতাত্বহ্‌হিরীন’।
১৯.মসজিদে প্রবেশের সময়-‘আল্লাহুম্মাফতা‘হলী আবওয়াবা র‘হমাতিক, পড়া এবং ডান পায়ে প্রবেশ করা।
২০. মসজিদের প্রবেশ করে ‘দু’রকা‘আত তা‘হিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করা’।
২১. তাকবীরে উলা তথা প্রথম তাকবীরে অংশগ্রহণ করা,( যা ইমাম আল্লাহু আকবার বলে নিয়্যত করার সাথে সাথে করতে হয়, না হয় তাকবীরে উলার ফযীলত পাওয়া যায় না।)।
২২.নামাযের শেষে তিনবার ‘আসতাগফিরুল্লাহ’, অতঃপর আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারকতা ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম, তিন তাসবী‘হ তথা ৩৩ বার সুব‘হানাল্লাহ, ৩৩বার আল-‘হামদু লিল্লাহ, ৩৩বার আল্লাহু আকবার পরিশেষে শতবার পুরণে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া‘হদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল ‘হামদু ইউ‘হয়ী ওয়া ইউমীত ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর’ বলা।
২৩.প্রত্যেক ফারয নামাযের পর ‘আয়াতুল কুরছী’ তথা-
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল ‘হাইয়ুল ক্বইয়ূম, লা তা’খুযুহূ সিনাতুও ওয়ালা নাওম, লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ্ব, মানঁযাল্লাযী ইয়াশফা‘উ ‘ইনদাহূ ইল্লা বি-ইযনিহী, ইয়া’লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়া মা খলফাহুম, ওয়া লা ইয়ু‘হীতূনা বি শায়ইম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমাশা’, ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব, ওয়া লা ইয়াঊদুহু হিফযুহুমা, ওয়া হুওয়াল ‘আলিইয়ূল ‘আযীম।
পড়া।
২৪. মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়-‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদ্বলিক’ পড়া এবং বাম পায়ে বের হওয়া।
২৫. রাস্তা-ঘাটে কাউকে দেখলে সালাম দেয়া, কেউ সালাম দিলে তার উত্তর দেয়া (এটা ওয়াজিব, না দিলে গুনাহগার হতে হবে)। সালামের সঠিক উচ্চারণ-
-আস সালামু ‘আলাকুম ওয়া র‘হমাতুল্ল-হি ওয়া বারকা-তুহ
-ওয়া ‘আলাইকুমুস সালামা ওয়া র‘হমাতুল্ল-হি ওয়া বারকাতুহ।
২৬. রস্তার ডান পাশে চলা, নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে চলা, চলার পথে কষ্টদায়ক কিছু দেখলে তা রাস্তা থেকে অন্যত্র ফেলে দেয়া।
২৭. শপথ নেয়ার সময়-‘ওয়াল্ল-হ/বিল্লা-হ/তাল্লাহ’ (তবে কথায় কথায় কসম বা শপথ দেত নিষেধ আছে)।
২৮. হাঁচি দেয়ার পর-আল-‘হামদু লিল্লা-হ।
২৯. অন্য কেউ হাঁচি দিলে-ইয়ার‘হামুকাল্ল-হ (এটা বলা এবং জোরে বলা ওয়াজিব, না হয় গোনাহগার হতে হবে)।
৩০. কেউ ভাল-মন্দ কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলে-‘আল-‘হামদু লিল্লা-হ’।
৩১. দু‘আর শেষে ‘আমীন’ বলা।
৩২. কোন ধর্মিয় বৈঠক শেষে সুব‘হানাল্লাহি ওয়া বি-হামদিহী সুব‘হানাকাল্লাহুম্ম আশহাদু আলঁলা- ইলাহা ইল্লা আনতাসগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইক’ বলা।
৩৩. কাউকে ভালোবাসলে ‘লি ‘হুব্বিল্লা-হ’ (আল্লাহর জন্য)।
৩৪. কারো সাথে দুশমনি রাখলেও ‘লি ‘হুব্বিল্লাহ’ (আল্লাহ্‌র জন্য)।
৩৫. কোন সমস্যা দেখা দিলে ‘তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্ল-হ’।
৩৬. পাপের অনুশোচনায়-তাওবাহ তথা ‘আসতাগফিরুল্ল-হ’ বলা।
৩৭. অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে বা দেখলে-‘না‘ঊযু বিল্লা-হ’।
৩৮. আনন্দদায়ক কিছু দেখলে-‘ফা-তাবারকাল্ল-হ’।
৩৯. দূঃখ বা মৃত্যুর সংবাদ শুনলে-‘ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না- ইলাইহি র-জি‘ঊন’।
৪০. আযানের ধ্বনি শুনলে মুআয্যিনের সহিত হুবহ আযানের বাক্যগুলো উচ্চারণ করা প্রত্যেক বাক্যের শেষে।
৪১. আযান শেষ হলে ‘আল্লাহুম্মা রব্বা হাযিহিদ দা’ওয়াতিত তা-ম্মাহ ওয়াস সলাতিল ক্বা-য়িমাহ আ-তি মু‘হাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদ্বীলাহ ওয়াব‘আছহু মাক্বামাম মা‘হমূদানিল্লাযী ওয়া‘ত্তাহ ‘হাল্লাত লাহূ শাফা‘আতী ইয়াউমাল ক্বিয়ামাহ ইন্নাকা লা- তুখলিফুর মী‘আদ’ পড়া।
৪২. আযান ও ইক্বামাতের মধ্যবর্তি সময়ে দু‘আ করা।
৪৩.রুগি দেখতে যাওয়া, সাথে কিছু হাদিয়া নিয়ে যাওয়া, রুগির জন্য দু‘আ করা, রুগির কাছে দু‘আ চাওয়া।

(আমাদের সমাজে এখনো পর্যন্ত এমন লোকও আছে যারা দু‘আ করা আর পড়ার পার্থক্যটুকু বুঝে না, যার কারনে দেখা যায় যে, তারা যে কোন দু‘আয়ই হাত উঠাতে শুরু করে। মনে রাখতে হবে যে সব দু‘আ পড়ার কথা বলা আছে সেসব দু‘আতে হাত উঠাতে হয় না। শুধুমাত্র দু‘আ করা সমেই হাত উঠানো যায়)

এরকম আরো হাজারো আমল রয়েছে যার উপর আমল করে আমরা নিজ জীবনকে আলোকিত করতে পারি, কাল ময়দানে মা‘হশারে রসূলের (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শাফা‘আত বা সুপরিশ পেতে পারি।

মহান রব্বুল ‘আলামীন আমাদেরকে রসূল (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসারে ‘আমল করার তাউফীক্ব দান করুণ। আমীন
দু‘আ প্রার্থী

Sunday, December 10, 2017

কবর যেয়ারত!


মাওলানা আতিক উল্লাহ
বর্তমানে চারপাশে পূণ্যের চেয়ে পাপের উপকরণ বেশি। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় গুনাহ হয়েই যায়। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা বড় কঠিন। আল্লাহর একান্ত প্রিয় বান্দাগনের পক্ষেই গুনাহমুক্ত থাকা সম্ভব। যতই সতর্কতা অবলম্বন করি, কোন ফাঁকে গুনাহ হয়েই যায়। তবে চেষ্টা করলে, গুনাহের মাত্রা কমিয়ে আনা যায়।

গুনাহমুক্ত থাকার জন্যে নাফসকে সচেতন রাখতে হয়। নাফসকে সচেতন রাখাতে হলে, মৃত্যুর স্মরণ, আখেরাতের স্মরণ, হাশর-নশরের স্মরণের কোনও বিকল্প নেই। আমি যতবেশি মৃত্যুকে স্মরণ করব, নাফস ততবেশি পাপকে ভয় করবে। আখেরাতের হিশেব-নিকেশের কথা স্মরণে রাখলে, মনে গুনাহভীতির অনভূতি জাগরূক থাকে। আমি গুনাহ করলে, শেষবিচারের দিন রবের সামনাসামনি দাঁড়াতে হবে,

فَأَمَّا مَن طَغَىٰ وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَىٰ وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ

যে ব্যক্তি অবাধ্যতা করেছিল এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছিল, জাহান্নামই হবে তার ঠিকানা। আর যে ব্যক্তি নিজ প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় পোষণ করত এবং নিজেকে মন্দ চাহিদা হতে বিরত রাখত, জান্নাতই হবে তার ঠিকানা (নাযি‘আত ৩৭-৪১)।

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সব সময় আখেরাতকে স্মরণ করতেন। সাহাবায়ে কেরামকেও আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। স্মরণ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। আখেরাতের স্মরণ আমাদেরকে পাপে পা দেয়া থেকে রক্ষা করে। তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এখনই তাওবা করব নাকি পরে, এই দ্বিধা দূর করে।

আখেরাতকে স্মরণে রাখার জন্যে নবীজি কিছু বিশেষ আমল নিয়মিত করতেন। কবর যেয়ারত তার অন্যতম আমল ছিল। প্রথম প্রথম নবীজি কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করতেন। নবীজির জন্যেও আল্লাহর পক্ষ থেকে কবর যেয়ারতের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। পরে নবীজিকে অনুমতি দেয়া হয়। তখন তিনি ঘোষণা দেন,

ققَدْ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ، فَقَدْ أُذِنَ لِمُحَمَّدٍ فِي زِيَارَةِ قَبْرِ أُمِّهِ، فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ 

আমি তোমাদেরকে কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করতাম। মুহাম্মাদকে তার মায়ের কবর যেয়ারত করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরাও (এখন থেকে) কবর যেয়ারত করবে। কারণ কবর যেয়ারত আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় (বুরাইদা রা: তিরমিযি)। 

কবর যেয়ারত করা চমৎকার এক সুন্নাত। এটা একটা সার্বজনীন কাজ। অন্যধর্মেও কবর যেয়ারতের প্রথা আছে। তারাও কবরে গিয়ে মৃতআত্মার স্মরণে ফুল দেয়। মোমবাতি জ্বালায়। নানা পূজোআচ্চা করে। আমরা মুসলমান। আমাদের রয়েছে কবর যেয়ারতের সুন্নত তরীকা। কবর যেয়ারত করলে, মৃত ও জীবিত উভয় পক্ষের জন্যে লাভ।

ক. কবরের সামনে গেলে, জীবিত ব্যক্তির আখেরাতের কথা মনে পড়ে। মন নরম হয়। আমলের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। পাপের পরিমাণ কমে আসে। চারিত্রিক উন্নতি ঘটে।

খ. কেউ কবর যেয়ারত করলে, মৃত ব্যক্তি কিছু দু‘আ লাভ করে। সওয়াব হাসিল করে। তার আযাব হালকা হয়। আমলনামা ভারী হয়।

নবীজি নিয়মিত জান্নাতুল বাকী‘তে যেতেন। অন্য কবরস্থানেও যেতেন। সাহাবায়ে কেরামও নবীজির দেখাদেখি কবর যেয়ারত করতেন। আমরাও নিয়মিত কবর যেয়ারত করতে পারি।

নবীজি যখন স্বামী!


আতিক উল্লাহ
আমাদের ইসলাম শ্রেষ্ঠ কেন? কারণ ইসলামই একমাত্র জীবনঘনিষ্ঠ ধর্ম। জীবনে প্রতিটি দিকেই ইসলাম দিক-নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। খাওয়া-শোয়া। বাজার-সরকার। পড়া-লেখা। জিহাদ-কিতাল। ঘরসংসার-দেনদরবার। ওজু-গোসল। বাসরঘর-রান্নাঘর। ড্রয়িংরূম-বাথরূম সব জায়গার আদর্শ আমাদের নবীজি রেখে গেছেন।

আজ আমরা দেখবো তিনি স্বামী হিশেবে কেমন ছিলেন। আমাদের কল্পনায় একজন স্বামীর যা যা গুণ থাকতে পারে, তার মধ্যে এর চেয়েও হাজারগুণ বেশি গুণাবলী বিদ্যমান ছিল।

নবীজ সা. স্ত্রীদের কাছে সবচেয়ে বড় সান্তনার জায়গা ছিলেন। তাদের অশ্রু মুছে দেয়ার মাধ্যম ছিলেন। তিনি স্ত্রীদের কোনও কথাকেই হেসে উড়িয়ে দিতেন না। তাদের আবেগ-অনুযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাদের মনোভার লাঘব করার চেষ্টা করতেন।

বর্তমানে বাজারে, সুখি দাম্পত্যজীবন বা সফল কপল বা কিভাবে ভালো স্বামী/স্ত্রী হবেন, মেসালি বিবি-শাওহার-এ ধরনের অনেক চটকদার বই পাওয়া যায়। কিছু বই বেস্টসেলারও হয়। কিন্তু কোনও বইই নবীজির মতো স্বামীর পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারবে না। নবীজির দাম্পত্যের অন্দরে একটু ঢুঁ মেরে দেখা যাক:

(এক) পাত্রের একই স্থানে মুখ লাগিয়ে পানাহার করতেন নবীজি:
আমি (আয়েশা) পান করে পাত্রটা নবীজির দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি আমার এঁটো করা স্থানেই মুখ লাগিয়ে পান করতেন। দাঁত দিয়ে গোশত ছিঁড়ে খাওয়ার পর আমার লালা লেগে থাকা স্থানেই তিনি মুখ লাগিয়ে খেতেন (মুসলিম)।

(দুই) স্ত্রীর গায়ে হেলান দিয়ে বসা:
তিনি আমি হায়েয অবস্থায় থাকলেও, আমার কোলে হেলান দিয়ে বসতেন (আয়েশা রা.-মুসলিম)।

(তিন) চুল আঁচড়ে দেয়া। নখ কেটে দেয়া:
তিনি মসজিদে থাকলেও, জানালা দিয়ে মাথাটা আমার হুজরার দিকে বাড়িয়ে দিতেন, আমি তার চুল আঁচড়ে দিতাম (আয়েশা রা.-মুসলিম)।

(চার) নবীজি সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন। ফাঁকে ফাঁকে স্ত্রীদেরকে সময় দিতেন। তবে রাতের বেলায়, চারদিক নিরব হয়ে এলে, তিনি আয়েশা রা.-এর সাথে ঘুরতে বের হতেন। হাঁটতে হাঁটতে কথাবার্তা বলতেন (বুখারী)।

(পাঁচ) স্ত্রীদের সাথে নবীজি হাসি-মজা করতে ভালোবাসতেন। তিনি নিজেই শুধু গল্প বলতেন তা নয়, স্ত্রীদের কাছ থেকেও গল্প শুনতেন। একবার আয়েশা রা. তাকে শুনালেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ!
ধরা যাক আপনি উট নিয়ে কোনও এক চারণভূমিতে গেলেন। সেখানে একটা গাছ আছে, যার পাতা আগেই খেয়ে ফেলা হয়েছে। আরেকটা গাছ আছে, যেটার পাতা এখনো অক্ষত! আপনি কোন গাছের কাছে উটকে নিয়ে যাবেন?
যে গাছে এখনো কোনও কিছু মুখ দেয়নি সেটার কাছে নিয়ে যাবো!
আয়েশা বোঝাতে চেয়েছিলেন, নবীজির স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বিয়ের সময় কুমারী ছিলেন। বাকীদের সবাই আগে অন্য স্বামীর ঘর করেছেন। (বুখারী)।

(ছয়) নবীজি গৃহস্থালি টুকিটাকি কাজেও হাত লাগাতেন। এটাসেটা করতেন। পুরোদস্তুর সাংসারিক। গৃহী।
নবীজি ঘরে থাকলে কী করতেন?
তিনি পরিবারের কাজে অংশ নিতেন! (বুখারী)।

(সাত) শুধু স্ত্রীদের ভালোবাসতেন না কিন্তু নয়, তাদের বান্ধবীদেরকেও ভালোবাসতেন। খোঁজখবর রাখতেন। যোগাযোগ ছিন্ন হতে দিতেন না। এটা সেটা হাদিয়া পাঠাতেন। ছাগল যবেহ হলেই কিছু গোশত আলাদা করে বলতেন:
এটা খাদীজার (অমুক) বান্ধবীর বাড়িতে দিয়ে এসো! (মুসলিম)।

(আট) মানুষ প্রশংসা ভালোবাসে। স্বীকৃতি চায়। স্ত্রীও স্বামীর মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে চায়। গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠতে চায়। নবীজিও স্ত্রীদের প্রশংসা করতেন:
সারীত যেমন সমস্ত খাবারের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, আয়েশাও তেমনি অন্য নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ (মুসলিম)।
সারীত হলো রুটির টুকরোকে ঝোলে ভিজিয়ে তৈরী করা এক প্রকার খাবার!

(নয়) আশেয়া রা.-এর কাছে তার ছেলেবেলার বান্ধবীরা আসতো। তার বয়েস তখনো কমই ছিল। পুতুল খেলতে পছন্দ করতেন। সইদের সাথে তিনি খেলতেন। নবীজি ঘরে এলে, খেলতে আসা সেহেলীরা পালিয়ে যেতো। নবীজি তাদেরকে অভয় দিয়ে আয়েশার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। খেলার সুযোগ করে দিতেন (মুসলিম)।

(দশ) ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার বস্তু নয়। যদি সেটা হালাল হয়। নিজের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও অন্যদের কাছে প্রকাশ করা যায়। খোদ নবীজি বলেছেন:
আমাকে খাদীজার ভালোবাসা দান করা হয়েছে। (তার প্রতি আমার ভালোবাসাটা আল্লাহর তরফিয়া)। মুসলিম।

(এগার) স্ত্রীর শুধু দোষ নয়, তার গুণগুলোও খুঁজে বের করা দরকার। সেগুলো প্রকাশ করা দরকার। অপছন্দনীয় কিছু দেখলে অমনিই তেতে ওঠার কোনও কারণ নেই:
স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যেন অন্যায় আচরণ না করে। তার কোনও একটা স্বভাব পছন্দ না হলেও, আন্য আরেকটা স্বভাব পছন্দ হবে! (মুসলিম)

(বারো) নবীজি বেগানা কোনও নারীর প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। কিন্তু রাস্তায় হাঁটলে অজান্তেই চোখ পড়ে গেলে, ঘরে চলে আসতেন:
তোমাদের যদি বেগানা কোনও নারীর দিকে তাকিয়ে ফেলে, মনে ‘ভিন্নচিন্তা’ জাগ্রত হলে, সে সাথে সাথে স্ত্রীর কাছে চলে যাবে। নিজের প্রয়োজন পুরো করবে (মুসলিম)।

(তেরো) একান্ত ঘরোয়া ব্যাপারগুলো বাইরের কারো কাছে না ভাঙা। দু’জনের গোপন বিষয় দু’জনের কাছেই থাকতে দেয়া:
কেয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তি হবে যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সেটা অন্যদের কাছে ফাঁস করে দেয় (মুসলিম)।

(চৌদ্দ) নবীজি স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসাকে নানাভাবে প্রকাশ করতেন। তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়ার সামান্যতম সুযোগও হাতছাড়া করতে চাইতেন না। তিনি রোযা থাকাবস্থায় চুমু দিয়ে ভালোবাসার জানান দিতেন (মুসলিম)।

(পনের) নবীজি পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। সব সময় স্ত্রীদের কাছে আসার আগে নিজেকে সুন্দর-সুগন্ধিময় করে নিতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
আমি তার চুলের সিঁথিতেও মিশকের সাদা অবশিষ্টাংশ দেখেছি। তখন তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলেন (মুসলিম)।

(ষোল) নবীজি সা. পালাক্রমে সব বিবির সাথে থাকতেন। আয়েশার প্রতি তার আলাদা একটা টান ছিল। নবীজি সব বিবির প্রতিই ইনসাফ কায়েম করার চেষ্টা করতেন। সাহাবায়ে কেরাম খোঁজ রাখতেন, নবীজি আয়েশার ঘরে কোনদিন যাবেন। সেদিন তারা বেশি বেশি হাদিয়া পাঠাতেন। নবীজির সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে (মুসলিম)।

(সতের) স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রাখা। তার মনকে বুঝতে পারা স্বামীর কর্তব্য। নবীজিও বিবিদের কার মেজায কেমন, বুঝতে পারতেন। সেটার প্রতি সম্মান দেখাতেন:
আয়েশা! আমি বুঝতে পারি, তুমি কখন আমার প্রতি রাজি থাকো আর কখন আমার প্রতি নারায থাকো! তুমি আমার প্রতি খুশি থাকলে বলো:
মুহাম্মদের রবের কসম!
আর আমার প্রতি অখুশি থাকলে বলো:
ইবরাহীমের রবের কসম! (মুসলিম)।

(আঠার) উমার রা. বলেছেন:
আমার স্ত্রী একবার আমার এক সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করলো। আমাকে সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করতে বললো। আমি অস্বীকৃতি জানালাম। স্ত্রী বললো:
বা রে! নবীজির স্ত্রীরা পর্যন্ত নবীজির কাছে কোনও কোনও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আবেদন জানাতেন! আর আপনি আমার ক্ষেত্রে অস্বীকার করছেন? উম্মুল মুমিনীনদের কেউ কেউ তো নবীর সাথে রাগ করে একদিন একরাত পর্যন্ত কথা বলেন নি, এমনো হয়েছে! (বুখারী)।

আহা নবীজিও! কী অসাধারণ সহনশীল মানুষ ছিলেন তিনি!

(উনিশ) আয়েশা রা. বলেছেন:
রাসূলুল্লাহ সা. কখনোই কোনও স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেননি (নাসায়ী শরীফ)। 
আর এখন এসিড পর্যন্ত ছুঁড়ে মারে। কথায় কথায় ডিভোর্স!

(বিশ) সাফিয়া রা. এক সফরে নবীজির সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। সাফিয়া কিছুটা ধীরে পথ চলছিলেন। পিছিয়ে পড়েছিলেন। নবীজি তার কাছে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলেন সাফিয়া কাঁদছেন আর বলছেন:
আপনি আমাকে একটা ধীরগামী গাধায় সওয়ার করিয়েছেন!
নবীজি স্নেহভরে সাফিয়ার চোখের অশ্রু মুছে দিলেন। তাকে না কেঁদে চুপ করতে বললেন (নাসায়ী)।
তিনি কতোই প্রেমময় ছিলেন। আমি হলে কী করতাম! দ্রুত চলতে না পারলে কেন এসেছ!

(একুশ) নবীজি আরও অবিশ্বাস্য (আমাদের যুগের দৃষ্টিভঙ্গিতে) কাজও করেছেন। তিনি বলেছেন:
তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দিবে, সেটার বিনিময়েও আল্লাহ তোমাকে সওয়াব দান করবেন (বুখারী)।
আহা এভাবে ভালোবাসতে জানলে, জীবনে আর কিছুর অভাব থাকে?

(বাইশ) স্ত্রীর চাহিদার প্রতিও নবীজির ছিল তীক্ষ্ন  নজর। তিনি বলেছেন:
তুমি যখন খাবার খাবে, স্ত্রীকেও খাওয়াবে। তুমি যখন পরিধান করবে, স্ত্রীকেও পরিধান করাবে (হাকেম)। 
অর্থাৎ তিনি স্ত্রীকে সমমর্যাদা দিয়ে রাখতে বলেছেন। দাসী-বাঁদী করে নয়।

(তেইশ) স্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখা। তাকে সন্দেহ না করা। নবীজি বলেছেন:
কোনও পুরুষ যেন রাতের বেলা না বলে, আচানক ঘরে এসে উপস্থিত না হয়, স্ত্রীর দোষ ধরার উদ্দেশ্যে (মুসলিম)।

(চব্বিশ) স্ত্রীর আবেগ অনুভূতির প্রতিও লক্ষ্য রাখা। নবীজি মিথ্যাকে একদম প্রশয় দেননি। কোনও প্রকার ছাড় দেননি। কিন্তু তিনটা ক্ষেত্রে মিথ্যার ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে একটা হলো:
পুরুষ স্ত্রীকে খুশী করার জন্যে মিথ্যা বললে অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে খুশী করার জন্যে মিথ্যা বললে! (নাসায়ী)।

(পঁচিশ) যার দুইজন স্ত্রী আছে, একজনের প্রতি বাহ্যিক আচরণে যদি বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কেয়ামতের দিন সে একপাশ ঝুঁকে থাকা অবস্থায় কবর থেকে উঠবে! (তিরমিযী)।
স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ করা আবশ্যক।

(ছাব্বিশ) কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকলেও স্ত্রীর খোঁজ-খবর রাখা। শুধু কাজ নিয়েই মজে না থাকা। সারাদিনে একবারও স্ত্রীর খোঁজ না নিয়ে, সুন্নাতের খেলাফ হওয়ার আশংকা আছে। আনাস রা. বলেছেন:
নবীজি রাতে বা দিনে, একবার হলেও স্ত্রীদের খোঁজ-খবর করতেন (বুখারী)

(সাতাশ) মায়মুনা রা. বলেছেন:
নবীজি স্ত্রীরা হায়েয অবস্থায় থাকলেও তাদেরকে আদর করতেন। পায়জামার উপর দিয়ে। নাপাক মনে করে তাদেরকে একেবারে ছেড়ে যেতেন না (বুখারী)।
এখানে শুধু আদরই করতেন, সহবাস নয়।

(আঠাশ) আয়েশা রা. বলেছেন:
একদিন আমি আর তিনি বসে আছি। এমন সময় যয়নব এলো। রাগান্বিতা অবস্থায়। নবীজি আমাকে বললেন:
নাও তার সাথে বিতর্ক করো!
আমি এমন তর্ক করলাম, কিছুক্ষণ পর দেখলাম যয়নবের মুখের লালা শুকিয়ে গেছে। সে আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না। রাসুলুল্লাহর দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি হাসছেন! ব্যাপারটা উপভোগ করছেন (ইবনে মাজা)।

(উনত্রিশ) নবীজি সফরে যাওয়ার সময়, স্ত্রীদের নামে লটারী করতেন। কাকে সাথে নিয়ে যাবেন। লটারীতে যার নাম উঠতো, তাকে সাথে নিয়ে যেতেন (মুত্তাফাক)।
আজ এই সুন্নাত বড়ই অবহেলিত। সবার এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। একটা মরা সুন্নাতকে জীবিত করার সওয়াব কি কম?

(ত্রিশ) স্ত্রীদের সাথে খেলাধূলা করা। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার নবীজি আমাকে বললেন: চলো দৌড় প্রতিযোগিতা করি! আমরা দৌড়ালাম। আমি তার চেয়ে এগিয়ে থেকে দৌড় শেষ করলাম। কিছুদিন পর আমি স্বাস্থ্য একটু ভাল হলে, তিনি আবার একদিন প্রতিযোগিতা দিতে বললেন। এবার তিনি জয়ী হলেন। মুচকি হেসে বললেন:
এটা সেটার বদলা, শোধবোধ। (আবু দাউদ)।

(একত্রিশ) স্ত্রীকে আদর করে অন্য নামে সম্বোধন করাও সুন্নত। আয়েশা রা. বলেছেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ছাড়া আপনার আর সব স্ত্রীদের একটা করে ‘কুনিয়ত’(উপনাম) আছে। তখন নবীজি আমার কুনিয়ত দিলেন: উম্মে আবদুল্লাহ। (আহমাদ)।

(বত্রিশ) স্ত্রীকে গল্প শোনানোও সুন্নাত। নবীজি সুযোগ পেলেই, স্ত্রীদেরকে গল্প শোনাতেন। খুনসুটি করতেন। চমৎকার একটা গল্প বুখারী শরীফে আছে। ‘উম্মে যরা’-এর গল্পটাতো বিখ্যাত।

(তেত্রিশ) ঈদে-উৎসবে স্ত্রীদেরও শরীক করা। তাদেরকে সাথে নিয়ে উপভোগ করা সুন্নাত। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার মসজিদের চত্ত্বরে কিছু হাবশী বালক বর্শা নিয়ে খেলাধূলা করছিল। নবীজি তাদের খেলা দেখছিলেন। আমিও তার পেছনে দাঁড়িয়ে, তার গায়ে হেলান দিয়ে খেলাটা উপভোগ করেছি (বুখারী)।

(চৌত্রিশ) কেউ কষ্ট পায় এমন শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করতেন না। স্ত্রীদের সাথে এবং খাদেমদের সাথেও। আনাস রা. বলেছেন:
আমি দশ বছর নবীজির খেদমত করেছি। একদিনের তরেও তিনি কোনও কাজের জন্যে আমাকে পাকড়াও করে বলেননি: কেন এমনটা করেছো?

(পঁয়ত্রিশ) স্ত্রীদের এবং অন্যদের শখের প্রতি তিনি সম্মান দেখাতেন। অন্যকে খাটো করে দেখতেন না। আয়েশা রা. বলেছেন:
আমি বান্ধবীদের সাথে পুতুল খেলতাম। তিনি ঘরে এলে, বান্ধবীরা ভয় পেয়ে যেতো। তারা লুকিয়ে পড়তো। কিন্তু নবীজি নিজেই সরে গিয়ে, তাদেরকে খেলার সুযোগ করে দিতেন। নিষেধ করতেন না (আদাবুল মুফরাদ)।

(ছত্রিশ) ঘরোয়া পরিবেশকে হাসি-আনন্দপূর্ণ রাখা। নির্দোষ দুষ্টুমি করাও সুন্নাত। আয়েশা রা. বলেছেন:
একবার সাওদা আমার ঘরে বেড়াতে এলেন। নবীজি একপা আমার কোলে, আরেক পা সাওদার কোলে তুলে দিলেন। আমি সাওদার জন্যে ‘হারীরা’ (এক প্রকার খাবার) তৈরী করলাম। তাকে বললাম:
খাও!
আমি খাবো না!
খাও বলছি,নইলে খাবারটা আমি তোমার মুখে মেখে দিবো!
না আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না!
আমি একমুঠ হারীরা উঠিয়ে সাওদার মুখে মেখে দিলাম। এটা দেখে নবীজি মিটিমিটি হাসছিলেন (নাসায়ী)।

(সায়ত্রিশ) একজনকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে না পড়া। পালা থাকলেও, সবার প্রতি দৃষ্টি রাখা। আয়েশা রা. বলেছেন:
খুব দিনই এমন গিয়েছে, নবীজি আমাদের সবার কাছে আসেননি। তিনি প্রায় প্রতিদিনই আসতেন। হাত ধরতেন। সবাইকে অন্তত চুমু হলেও খেতেন। সবার শেষে যেতেন, আজ যার কাছে থাকার পালা, তার ঘরে (তাবাকাতে সা‘দ)।

(আটত্রিশ) স্ত্রীদের সাথে সাময়িক মনোমালিন্য হলেও নবীজি কাউকে খাটো করতেন না। কথাবার্তায় কোমল পন্থা অবলম্বন করতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
ইফকের ঘটনায়, তিনি আমার প্রতি আগের মতো উচ্ছ্বাসিত ছিলেন না। আমি অভিযোগ করলে, তিনি কোমল আচরণ করতেন। কিন্তু আমার কষ্ট লাগতো, আমি সে ঘটনার ভার সইতে না পেরে, অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তিনি এসে আমার আম্মার কাছে জানতে চাইতেন:
সে কেমন আছে?
নাম নিতেন না (বুখারী)।

(উনচল্লিশ) স্ত্রীরা অসুস্থ হলে, নবীজি তাদের সেবা-সুশ্রুষা করতেন। আয়েশা রা. বলেছেন:
আহলে বাইতের কেউ অসুস্থ হলে, তিনি ‘আউযু’ সম্বলিত আয়াতসমূহ পড়ে ফুক দিতেন (মুসলিম)।

(চল্লিশ) নবীজি সা. অন্যদেরকে ভাল স্বামী হতে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করতেন। নিজে একজন ভাল স্বামী হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তো ছিলেনই, তারপরও মৌখিকভাবেও বলতেন:
তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলো, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম বলে বিবেচিত সেই! (তিরমিযী)।

(একচল্লিশ) নবীজি সফর থেকে এসে, চট করে ঘরে চলে যেতেন না। স্ত্রীদেরকে সাজগোজ করার সুযোগ দিতেন। প্রস্তুতি নেয়ার সময় দিতেন। জাবের রা. বলেছেন:
আমরা একবার সফর থেকে মদীনায় ফিরলাম। ঘরে যেতে উদ্যত হলে, নবীজি বললেন:
থামো, স্ত্রীদেরকে সুযোগ দাও। রাতের দিকে ঘরে যেয়ো। স্ত্রীরা এর মধ্যে ‘ক্ষৌরকর্ম’ সেরে নিতে পারবে। আলুলায়িত কেশ বিন্যাস করে নিতে পারবে! (নাসায়ী)।

নবীজি সা.-এর চেয়ে ভাল স্বামী হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব? অন্তত চেষ্টা করতে দোষ কী? তার মতো আমদেরও সব স্ত্রীর প্রতি সমান নজর রাখা অবশ্য কর্তব্য। তাদের অধিকার আদায় করার অপরিহার্য।

Tuesday, November 21, 2017

ইসলামী শরীয়তে টুপির বিধানঃ পর্ব (১)

টুপি মুসলিম উম্মাহর জাতীয় নিদর্শন বাইসলামের অন্যতম ‘শিআর’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদগণ সহ সর্ব যুগে টুপি পরিধান করার প্রচলন মুসলিম সমাজে ছিল এবং অদ্যাবধি আছে। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপিকে মুসলিম এবং কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী নির্ধারণ করেছেন। কাফিররা পাগড়ি পরিধান করে কিন্তু টুপি পরিধান করে না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের পাগড়ির নিচে টুপি পরিধান করে বিধর্মীদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিতেন। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি কিংবা পাগড়ি ব্যতীত খোলা মাথায় কখনও নামায আদায় করেছেন বলে কোন বিশুদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় না।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ইদানিং কিছু মুসলমান টুপির ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন এমনকি একে অবজ্ঞা করার ও দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। নামাযের বাইরে তো দূরের কথা, নামাযের সময় ও তারা টুপি পরিধান করেন না এবং এ ব্যাপারে কোন দলীল প্রমাণ নেই বলে প্রচারণা চালান। কিছু প্রবাসী ভাই যারা আরব দেশগুলোতে থাকেন তারা এসে বলেন, আরবে নাকি টুপির রেওয়াজ বা গুরুত্ব নেই। খালি মাথায়ই তারা নামায পড়ে। তারাও একটি কারণ দর্শান, টুপির ব্যাপারে হাদীস শরীফে কোন বর্ণনা নাকি পাওয়া যায় না।

এই খানে আমরা টুপি প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস ও সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আছার এবং কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করব যা টুপির ব্যাপারে সব ধরণের সন্দেহ ও দ্বিধা অপনোদনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র অনুসৃত মাযহাব চতুষ্টয়ের ফতওয়া উল্লেখ করব।এবং বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টিতে টুপি ব্যাবহারের উপকারীতাও রয়েছে। সাধ্যানুযায়ী তার কিছু অলোচনা করার প্রয়াস চালাবো। সাথে সাথে টুপির ব্যাপারে অনীহা প্রদর্শনকারী মহল যাকে তাদের ইমাম মানে এবং যার তাহকীককে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করে সেই নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতামতও আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশা আল্লাহ।

টুপির সংঙ্গাঃ
টুপি শব্দটি উর্দূ। হাদিস শরীফে টুপির জন্য তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
১. কালানসুয়াহঃ শাব্দিক অর্থ- লুকায়িত, ঢেকে দেওয়া বস্তু, এক প্রকারের মাথার পোশাক,
সুপরিচিত। ইংরেজী অভিধানে'কালানসুয়াহ'
এর অর্থ-Tall headgear,Tiara, Cidaris,
Hood, Cowl, Capuche, Cap.

পারিভাষিক অর্থঃ"কালানসুয়াহ বলা হয়,যা মাথার উপর পরিধান করা হয় এবং তার ওপর পাগড়ি পরিধান করা হয়।" (রদ্দুল মুহতার)

২. বুরনুসঃ এর অর্থ- এমন কাপড়, যার অংশ
বিষেশ মাথার সঙ্গে লেগে থাকে।(আর রায়েদ) ভাষাবিদ আল্লামা জাওহারীর মতে, বুরনুস বলা হয় লম্বা টুপিকে।হযরতমুতামের (রহ.)বলেন,আমি আনাস(রাঃ)-এর মাথায় লম্বা টুপি দেখেছি।(বোখারী শরীফ)

৩. কিমাম বা কুম্মাহঃ এর অর্থ গোল টুপি।(মিরকাত শরহে মিশকাত) প্রখ্যাত অভিধানবিদ আল্লামা মাজদুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব
ফাইরোজাবাদী প্রনীত 'আল কামুসুল মুহীত' গ্রন্হে এবং বিখ্যাত আধুনিক অভিধান 'আলমুজামুল ওয়াসীত'-এও কুম্মাহ অর্থ গোল টুপি লেখা
হয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, রাসূল (সাঃ) -এর টুপি এ ধরনের ছিলো যে তা মাথার সাথে লেগে থাকতো। (তিরমিযী শরীফ)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর টুপিঃ
টুপি পরিধান এবং পাগড়ি বাঁধা রাসূলের সুন্নত। রাসূলে আকরাম (সাঃ) মস্তকাবরন হিসেবে তিন প্রকারের পোশাক- টুপি,পাগড়ি ও রুমাল ব্যবহার করেছেন।নামায ছাড়াও সর্বাবস্হায় রাসূল(সাঃ),
সাহাবায়ে কেরামগন টুপি ব্যবহারের আমল ছিলো। হযরত হাফিয আবু শাইখ ইসফাহানী (রহ.) তাঁর ‘আখলাকুন নবী’ গ্রন্থে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর টুপির বর্ণনা নামক আলাদা একটি অধ্যায় সংযোজন করেছেন।এবং সেখানে তিনি অনেক গুলো হাদীস উল্লেখ করেছেন।সকলের স্মৃতিপটে বদ্ধমূল হওয়ার জন্যে নিম্নে তার থেকে ক টি হাদীস পেশ করা হলোঃ

১.হাসান বিন মেহরান থেকে বর্ণিত-

عن رجل من الصحابة : قال : أكلت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ورأيت عليه قلنسوة بيضاء فى وسط رأسه.

একজন সাহাবী বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তাঁর দস্তরখানে খেয়েছি এবং তাঁর মাথায় সাদা টুপি দেখেছি’ (আল ইসাবাহ ৪/৩৩৯)

এ হাদীসটি ইমাম ইবনুস সাকান তার কিতাবুস সাহাবায় সনদসহ বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর এ বর্ণনায় সাহাবীর নাম আসেনি। তা এসেছে তাঁর অন্য বর্ণনায় এবং ইমাম বুখারী ও ইমাম আবু হাতেমের বর্ণনায়। তাঁর নাম ফারকাদ। ( আততারীখুল কাবীর ৭/১৩১; কিতাবুল জারহি ওয়াত তা’দীল ৭/৮১)

উল্লেখ্য, ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. ইমাম ইবনুস সাকানের উপরোক্ত বর্ণনার দ্বারা আবু নুআইম আল আসবাহানী রহ.এর এ দাবি খন্ডন করেছেন যে, ফারকাদ সাহাবী আল্লাহর নবীর দস্তরখানে খাবার খাননি। বরং হাসান ইবনে মেহরান খাবার খেয়েছেন সাহাবী ফারকাদের সাথে। (মারিফাতুস সাহাবা ৪/১০৪)

হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন, এ ক্ষেত্রে আবু নুআইমই ভুলের শিকার হয়েছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি ইমাম ইবনুস সাকানের উপরোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। এতে প্রমাণিত হয় এ বর্ণনা সহীহ। অন্যথায় প্রমাণ-গ্রহণ শুদ্ধ হতো না। এবং আবু নুআইম এর মত ইমাম এর কথাকে খন্ডন করা যেত না।

তাছাড়া সাহাবী ফারকাদ রা.এর আল্লাহর নবীর দস্তরখানে খাবার খাওয়ার কথা ইমাম বুখারী, ইমাম আবু হাতেম ও ইবনু আবদিল বারও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

২. রাসূল(সাঃ)এর সহধর্মিনী,উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত—

أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يلبس من القلانس في السفر ذوات الآذان، وفي الحضر المشمرة يعني الشامية.

সফরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন টুপি পরিধান করতেন যা দ্বারা কান ঢাকা যায় এবং বাড়িতে অবস্থানকালে শামে তৈরি (সাধারণ) টুপি পরিধান করতেন।(আল জামে লিআখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে পৃঃ২০২,
তারিখে দামেশক লিইবনিল আসাকিরঃ ৪/১৯৩,
আল জামিউস সগীর, হাদিসঃ১০০৯৩)

এ হাদীসের সকল রাবী ‘ছিকা’ তথা নির্ভরযোগ্য।উরওয়া ও হিশাম তো প্রসিদ্ধ ইমাম। আর মুফাদদাল ইবনে ফাদালা নামে দুইজন রাবী আছেন। একজন মিসরী, তিনি অনেক বড় ইমাম ছিলেন।মিসরের কাযী ছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে তিনি ‘ছিকা’।

আসমাউর রিজালের কিতাবাদি থেকে প্রতীয়মান হয় সনদে উল্লেখিত ব্যক্তি ইনিই। কারণ তিনিই হিশাম ইবনে উরওয়া ও ইবনে জুরাইজ থেকে রেওয়ায়েত করেন যা আল্লামা ইবনে আদী ও আল্লামা মুহাম্মাদ বিন হাসান বিন কুতায়বা তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। (আল-কামিল ৭/৪০৯ ইকমালু তাহযীবিল কামাল ১১/৩৩৮) অপর জন বসরী। তাঁর স্মৃতিশক্তির বিষয়ে কিছু আপত্তি থাকলেও ইবনে হিববান তাকে ছিকা রাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন। আবু হাতেম বলেছেন يكتب حديثهআর ইমাম ইবনে আদী তার একটি বর্ণনাকে‘মুনকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাকিগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন-তার অন্য বর্ণনাগুলো সঠিক।’ সুতরাং সনদে উল্লেখিত রাবী যদি বসরীও হন তবুও তার এ বর্ণনা সঠিক।

৩. উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-

الشهداء أربـعـة: رجل مؤمن جيد الايمان، لقى العدو ، فصدق الله حتى قتل ،فذلك الذى يرفع الناس اليه أعينهم يوم القيامة هكذا ، ورفع رأسه حتى وقعت قلنسوته، قال فما ادرى أقلنسوة عمر أراد أم قلنسوة النبى صلى الله عليه وسىلم ؟

শহীদ হল চার শ্রেণির লোক। এমন মুমীন যে তার বিশ্বাসে স্থির এবং দৃঢ়। শত্রুদের মুকাবেলায় সে শহীদ হয় এমন অবস্থায় যে সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উপর পূর্ণ আস্থাবান ও বিশ্বাসী। 

কিয়ামতের দিন তার মর্যাদা এত উচ্চ হবে যে মানুষ তার দিকে এভাবে তাকাবে-এই বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাথা তুললেন। তখন তাঁর টুপি পড়ে গেল। অথবা বলেছেন উমরের টুপি পড়ে গেল। বর্ণনাকারি বলেন, আমি জানি না কার টুপির কথা বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের না উমর (রা.)-এর। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১৪৬, জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৬৪৪)।

হাদীসটির ক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযী বলেছেন, ‘হাসানুন গারীবুন।’অর্থাৎ হাদিসটির সনদ গ্রহনযোগ্য। যদিও হাদীসে টুপি কার সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে তথাপি বলা যায়, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের টুপি হয় তবে তো বিষয়টি প্রমাণিতই। আর যদি হযরত উমর (রা.)-এর টুপি হয় তাহলেও তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে খুলাফায়ে রাশেদীনের একজনের টুপি পরা প্রমাণিত হচ্ছে। আর খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ তো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহরই অংশ।

৪.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে একজন আনসারী সাহাবী তাঁর কাছে এলেন। এবং তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি ফিরে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আনসারী! আমার ভাই সাদ ইবনে উবাদাহ কেমন আছে? আনসারী বললেন, ভাল আছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কে কে তাকে দেখতে যাবে? অতপর তিনি দাঁড়ালেন আমরাও দাঁড়ালাম। আমরা সংখ্যায় দশের অধিক হব। আমাদের পায়ে মোজাও ছিল না। চপ্পলও না। গায়ে জামাও ছিল না, টুপিও না। ঐ কংকরময় ভূমিতে আমরা চলছিলাম। অবশেষে আমরা সাদ এর নিকট পৌঁছলাম তখন তার পাশ থেকে মানুষজন সরে গেল। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীরা প্রবেশ করলেন।

এখানে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর বাক্য ‘‘আমাদের পায়ে মোজাও ছিল না, চপ্পলও না। গায়ে জামাও ছিল না টুপিও না’’ থেকে বোঝা যায়, ঐ যুগে টুপিও ছিল লিবাসের অংশ।এবং কোথাও যাওয়ার জন্য সেগুলো রীতিমত আবশ্যকীয় এর ন্যয় ছিল। তাই এখানে এগুলো না থাকায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর তা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি ঠিক এরকম যেমন ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে বুরনুস প্রমাণ করেছেন। সহীহ বুখারীতে কিতাবুল লিবাসে ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺒﺮﺍﻧﺲ নামে শিরোনাম দাঁড় করেছেন আর দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন হজের একটি হাদীস।

ﻻ ﻳﻠﺒﺲ ﺍﻟﻤﺤﺮﻡ ﺍﻟﻘﻤﻴﺺ ﻭﻻ ﺍﻟﻌﻤﺎﺋﻢ ﻭﻻ ﺍﻟﺒﺮﺍﻧﺲ

‘‘ইহরাম গ্রহণকারী জামাও পরবে না, পাগড়ীও না, বুরনুস (এক প্রকার টুপি)ও না।’’

আল্লামা আবু বকর ইবনুল আরাবী এ হাদীস থেকে পাগড়ী প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, তৎকালে পাগড়ী পরিধানের রীতি ছিল। এ কারণে ইহরাম অবস্থায় তা পরিধান করা নিষেধ করেছেন।

৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

كان رسول الله صلى الله عليه وسىلم ،
يلبس قلنسوة بيضاء.

"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা টুপি পরিধান করতেন।(তাবরানী কাবীরঃ১৩/২০৪, আল জামিউস সাগীর, হাদিস নং১০০৯২)

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী(রহ.)ও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাবারানী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন আর ইমাম সুয়ুতী তাঁর ‘সিরাজুল মুনীর’ গ্রন্থের ৪র্থ খ-, ১১২ নং পৃষ্ঠায় হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

৬. হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— 

رأيت رسول الله صلى الله عليه وسىلم ،
وعليه قلنسوة بيضاء شامية .

"আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শামে (সিরিয়ার) তৈরি সাদা টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।(শরহু মুসনাদি আবী হানীফা, পৃঃ ১৪২)

৭. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিন প্রকার টুপি ছিলো। সাদা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি, ডোরাদার ইয়ামানী চাদর দ্বারা নির্মিত টুপি এবং কান ঢাকা যায় এমন টুপি যা তিনি সফরকালে পরতেন এবং কখনো কখনো সালাত আদায়ের সময় সেটিকে সামনে রেখে দিতেন।(আখলাকুননবীঃ২/২২১-৩১৫)

ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন রকম টুপি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানেও পবিত্র মক্কায় তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপির প্রচলন আছে এবং সেখানকার মানুষ সাধারণত এই টুপি ব্যবহার করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ইয়ামানের তৈরি ডোরাদার কাপড়ের টুপিও ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া কান ঢাকা যায় এমন টুপিও তিনি ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে এর আগের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষোক্ত ধরণের টুপি যেহেতু তিনি সফরের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন তাই সালাতের সময় তা খুলে সামনে রেখে দিতেন।

সীরাত প্রণেতা ইমামগণও আল্লাহর নবীর পোষাকের অধ্যায়ে তাঁর টুপির জন্যও আলাদা পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করেছেন। ইবনে হাইয়্যান বর্ণিত হাদীসগুলো তো আমরা এখানে উল্লেখ করলাম। এছাড়াও ইবনুল কায়্যিম,ইবনে আসাকির, ইবনুল জাওযী, শায়খ ইউসুফ সালেহী, আল্লামা দিময়াতী, বালাযুরীসহ আরো অনেক ইমাম তাদের সীরাত গ্রন্থে এ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ সংযুক্ত করেছেন। কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমরা এখানে শুধু ইবনুল কায়্যিম (র.)-এর বক্তব্য তুলে ধরছি। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ’-এ লেখেন, তাঁর একটি পাগড়ি ছিল, যা তিনি আলী (রা.) কে পরিয়েছিলেন। তিনি পাগড়ি পরতেন এবং পাগড়ির নিচে টুপি পরতেন। তিনি কখনো পাগড়ি ছাড়া টুপি পরতেন। কখনো টুপি ছাড়াও পাগড়ি পরতেন। (যাদুল মাআদ ১/১৩৫)

আলোচিত হাদীসগুলো দ্বারা টুপি ও তার প্রচলন প্রমাণে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

Thursday, November 16, 2017

নামাযের ভেতরে ও বাহিরের ফরযসমূহ

নামাযের ভেতরে ও বাহিরের ফরযসমূহ
নামাযের ফরয ১৩ট
নামাযের বাইরে ৭টি
১. শরীর পাক হওয়া।
(সূরা মায়িদা আয়াত : ৬)
২. কাপড় পাক হওয়া।
(সূরা মুদ্দাছ্ছির, আয়াত : ৪)
৩. নামাযের জায়গা পাক হওয়া।
(সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)
৪. ছতর ঢাকা (অর্থাত পুরুষগণের নাভী হতে হাঁটুর নীচ
পর্যন্ত এবং মহিলাদের চেহারা, কব্জি পর্যন্ত দুই হাত
এবং পায়ের পাতা ব্যতিরেকে সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা)।
(সূরা আ‘রাফ, আয়াত : ৩১)
৫. কিবলামুখী হওয়া।
(সূরা বাকারা, আয়াত : ১৪৪)
৬. ওয়াক্তমত নামায পড়া।
(সূরা নিসা আয়াত : ১০৩)
৭. অন্তরে নির্দিষ্ট নামাযের নিয়ত করা।
(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ১)

নামাযের ভিতরে ৬টি
১. তাকবীরে তাহরীমা অর্থাত শুরুতে আল্লাহু আকবার বলা।
(সূরা মুদ্দাছছির, আয়াত : ৩)
২. ফরয ও ওয়াজিব নামায দাঁড়িয়ে পড়া।
(সূরা বাকারা, আয়াত : ২৩৮)
৩. ক্বিরা‘আত পড়া (অর্থাত কুরআন শরীফ হতে ছোট এক
আয়াত পরিমাণ পড়া।)
(সূরা মুয্যাম্মিল ,আয়াত : ২০)
৪. রুকু করা।
(সূরা হজ্জ, আয়াত : ৭৭)
৫. দুই সিজদা করা।
(সূরা হজ্জ, আয়াত : ৭৭)
৬. শেষ বৈঠক (নামাযের শেষে তাশাহহুদ পরিমাণ বসা)
(আবু দাউদ, হাঃ নং ৯৭০)

বি.দ্র. নামাযী ব্যক্তির নিজস্ব কোন কাজের মাধ্যমে (যেমন- সালাম ফিরানো) নামায থেকে বের হওয়াও একটা ফরয। (আল বাহরুর রায়িক, ১ : ৫১৩)

নামাযের কোন ফরয বাদ পড়লে নামায বাতিল হয়ে যায়। সাহু সিজদা করলেও নামায সহীহ হয় না।
(প্রমাণ : আল বাহরুর রায়িক,১ : ৫০৫) শামী, ১ : ৪৪৭/ হিদায়া, ১ : ৯৮)