নোটিশ
আপনি কি ব্লগ কিংবা ফেসবুকে ইসলাম এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে আগ্রহী?
তাহলে আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ দিন। ধন্যবাদ
Showing posts with label শ্রেষ্ঠ মনিষীদের জীবনী. Show all posts
Showing posts with label শ্রেষ্ঠ মনিষীদের জীবনী. Show all posts

Saturday, December 2, 2017

শামায়েলে মুহাম্মাদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) ( পর্ব-২)

শামায়েলে মুহাম্মাদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) ( পর্ব-২)

● মুহাম্মাদ হারুন আযীযী নদভী
রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৌন্দর্যের বর্ণনাঃ
রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৌন্দর্যের বর্ণনা করতে গেলে শেষ হবে না। কথা, কাজ, চলাফেরা ও আচার-ব্যবহার ইত্যাদি সবদিক দিয়ে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে সুন্দর। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যও ছিল অতুলনীয় এবং অদ্বিতীয়।
১. আনাস (রা) বলেন, আল্লাহর রাসূল  ছিলেন সবার চেয়ে বেশী সুন্দর। [সূত্র: ২৯]
২. বারা ইবনে আযেব (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -এর চেয়ে বেশী সুন্দর কোন বস্তু কোন দিন দেখিনি। [সূত্র:৩০]
৩. জাবের ইবনে সামুরা (রা) বলেন, এক চাঁদনী রাতে আমি নবী করীম  কে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর পরনে ছিল একজোড়া লাল রং-এর পোষাক। আমি রাসূলুল্লাহ  এর দিকে এবং চাঁদের দিকে তাকাতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ -কেই আমার কাছে চাঁদের চেয়েও অনেক বেশী সুন্দর মনে হল। [সূত্র: ৩১]
৪. আলী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -এর পূর্বে ও পরে তাঁর মত কোন ব্যক্তি দেখিনি। [সূত্র: ৩২]
৫. আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ  এর চেয়ে বেশী সুন্দর কিছু দেখিনি। তার কাপালে যেন সূর্য প্রবাহিত ছিল। [সূত্র: ৩৩]
৬. আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ  ছিলেন লোকজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সুন্দর। [সূত্র: ৩৪]
৭. আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর শারীরিক গঠন অত্যন্ত সুন্দর ছিল। [সূত্র: ৩৫]
৮. আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ  এর পরে তাঁর মতো কাউকে দেখিনি। [সূত্র: ৩৬]
৯. আনাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পূর্বে ও পরে তার মত কাউকে দেখিনি। [সূত্র: ৩৭]
১০. জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর পর তার সদৃশ কাউকে দেখিনি। [সূত্র: ৩৮]

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চেহারা মুবারকের বর্ণনাঃ
রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মুখমন্ডল ও চেহারা অতি সুন্দর চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও গোলাকার ছিল।
১. বারা ইবনে আযেব (রা) বলেন, লোকদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মুখমন্ডল ছিল সর্বাধিক সুন্দর। [সূত্র: ৩৯]
২. বারা (রা) কে জিজ্ঞেস করা হল, নবী (সা:) এর চেহারা কি তরবারীর ন্যায় চকচকে ও লম্বা ছিল? তিনি বললেন , না; বরং চাঁদের ন্যায় (স্নিগ্ধ ও) উজ্জ্বল ছিল । [সূত্র: ৪০]
৩. আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, একদা রসূলুল্লাহ (সা:) অত্যন্ত উৎফুল্ল চিত্তে তার নিকট প্রবেশ করলেন। (খুশির আমেজে) তার কপালের রেখাগুলিও যেন চমকাচ্ছিল । [সূত্র: ৪১]
৪. কাব ইবনে মালেক (রা) বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে যখন সালাম করলাম, তখন তাঁর মুখমন্ডল খুশীর আমেজে চমকাচ্ছিল। আর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর অবস্থা ছিল এই যে, যখন তিনি (কোন কারণে) উৎফুল্লা হতেন, তখন তাঁর মুখমন্ডল ঔজ্জ্বল্যের কারণে চমকাতে থাকত। মনে হত, যেন চাঁদের একটি টুকরো। আর আমার এটা তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই আঁচ করতে পারতাম। [সূত্র: ৪২]
৫. জাবের ইবনে সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মুখমন্ডল ছিল চাঁদ-সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল এবং গোলাকার । [সূত্র: ৪৩]
৬. আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ঘামের ফোটা তাঁর চেহারায় মুক্তার মত দেখাত। [সূত্র: ৪৪]
৭. আবু তুফাইল (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে দেখেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি ছিলেন সাদা বর্ণের সুন্দর সুশ্রী চেহারা বিশিষ্ট । [সূত্র: ৪৫]
৮. জাবের ইবনে সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ছিলেন বড় মুখ-গহ্বর বিশিষ্ট । [সূত্র: ৪৬]
৯. ওমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর দাঁতগুলি ছিল অত্যন্ত সুন্দর । [সূত্র: ৪৭]
১০. আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর গন্ডদ্বয় ছিল কোমল, মসৃণ ও লাবণ্যময়ী । [সূত্র: ৪৮]

কপালের বর্ণনাঃ
রাসুলুল্লাহ (সা:) এর কপাল ছিল প্রশস্ত। যখন ‘অহি’ নাযিল হ’ত তখন ঘাম পড়ত এবং ঘামের ফোঁটাগুলি তাঁর কপালে মণি-মুক্তার মত দেখাত।
১. আয়েশা (রা) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (সা:) এর উপর ‘অহি’ নাজিল হওয়ার পর তার কপাল থেকে ঘাম ঝড়ে পড়তে দেখেছি । [সূত্র: ৪৯]
২. যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা:) এর উপর ‘অহি’ নাজিল হত, তখন তিনি গম্ভীর হয়ে যেতেন এবং তার কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত মুক্তার ন্যায়। অথচ তা ছিল শীতকাল । [সূত্র: ৫০]
৩. আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চেয়ে বেশী সু্ন্দর আর কিছু দেখিনি। তার কপালে যেন সূর্য চলাচল করত । [সূত্র: ৫১]

চক্ষুদ্বয়ের বর্ণনাঃ
রসূলুল্লাহ (সা:) এর চক্ষুদ্বয় ছিল লম্বা ভ্রু যুক্ত কালো। চোখের তারকা ছিল ঘোর কৃষ্ঞবর্ণের এবং চোখের পাতার চুল ছিল কোমল ও দীর্ঘ ।
১. আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চক্ষুদ্বয় ছিল সুরমা রঙের এবং চোখের পাতা ছিল দীর্ঘ কোমল । [সূত্র: ৫২]
২. জাবের ইবনে সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর চক্ষুদ্বয় ছিল লাল ডোরাযুক্ত। অর্থাৎ চক্ষুদ্বয়ের সাদা অংশে লাল আভা মিশ্রিত ছিল । [সূত্র: ৫৩]
৩. হযরত আলী (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) এর চক্ষুদ্বয়ের তারকা ছিল কালো, উভয় চোখের পাতা ছিল লোম বিশিষ্ট । [সূত্র: ৫৪]

মস্তকের বর্ণনাঃ
১. আনাস (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) এর মস্তক ছিল আকারে বড় । [সূত্র: ৫৫]
২. আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর মস্তকের আকৃতি ছিল বড় । [সূত্র: ৫৬]
হাতদ্বয়ের বর্ণনাঃ
১. আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর উভয় হাত ছিল মাংসল ও আকারে বড় । [সূত্র: ৫৭]
২. আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর উভয় হাত গোস্তে পূর্ণ ছিল । [সূত্র: ৫৮]
৩. আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর হাতের তালু গোশতে পুরু ছিল । [সূত্র: ৫৯]

হাতের কোমলতাঃ
১. আনাস (রা) বলেন, কোন রেশম কিংবা কোন গরদকেও আমি নবী (সা:) এর হাতের তালু অপেক্ষা অধিকতর কোমল পাইনি । [সূত্র: ৬০]

হাতের শীতলতা ও সুগন্ধিঃ
১. আবু জুহাইফা (রা) বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) এর হাত টেনে আমার মুখের উপর রাখলাম, আমার মনে হল যেন তার হাত বরফের চেয়েও অধিকতর শীতল এবং মেশক এর চেয়েও অধিকতর সুগন্ধিযুক্ত । [সূত্র: ৬১]
২. জাবের ইবনে সামুরা (রা) বলেন, নবী করীম (সা:) আমার গন্ডদ্বয়ে হাত মুছে দিলেন, আমি তার হাতের শীতলতা অনুভব করলাম আর এমন সুগন্ধি পেলাম, মনে হল যেন তা আতর বিক্রেতার ভান্ড থেকে এক্ষণি বের করলেন । [সূত্র: ৬২]

বগলদ্বয়ের বর্ণনাঃ
১. আব্দুল্লাহ ইবনে মালেক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন সিজদা করতেন তখন হাতকে পার্শ্ব থেকে দূরে করতেন এমনকি উভয় বগলের শুভ্রতা দেখা দিত। [সূত্র: ৬৩]
২. আনাস (রা) বলেন, ইস্তেসক্কার সময় রাসূলুল্লাহ (সা:) উভয় হাত এতটা উত্তোলন করতেন যে, তার বগলদ্বয়ের শুভ্রতা পরিদৃষ্ট হত। [সূত্র: ৬৪]

উভয় কাঁধের বর্ণনাঃ
১. রাসুলুল্লাহ (সা:) এর উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল । [সূত্র: ৬৫]

পিঠের বর্ণনাঃ
১. মুহাব্বিশ (রা) বলেন, রাসূলুল্লহ (সা:) এর পিঠের দিকে একদা আমি দেখলাম। মনে হল যেন রুপা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে । [সূত্র: ৬৬]
২. আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন উভয় কাঁধ থেকে চাদর সরাতেন তখন (পিঠকে) মনে হত যেন চাঁদি দ্বারা তৈরী করা । [সূত্র: ৬৭]
………………………
(চলবে ইনশা-আল্লাহ)
উৎসঃ
২৯. বুখারী হা/৬০৩৩; মুসলিম হা/২৩০৭; তিরমিযী হা/১৬৮৫ ।
৩০. বুখারী হা/৩৫৫১;মুসলিম হা/২৩৩৭;শামায়েল হা/৩ ।
৩১. তিরমিযী, কিতাবুল আদাব, হা/২৮১১;শামায়েল হা/৮; দারিমী ১/৩০; মুস্তাদরাক ৪/৩০৪ পৃ: হা/৭৪৬১।
৩২. তিরমিযী, কিতাবুল মানাক্বেব, হা/৩৬৪১; শামায়েল হা/৫; মুসনাদু আহমাদ ১/৯৬ পৃ:হা/৭৪৬; মুস্তাদরাক ২/৬০৬ পৃ: ।
৩৩. ইবনে সাদ ১/৩১৯ পৃ: ; ছহীহ ইবনে হিব্বান হা/৬৩১৮; মুসনাদু আহমাদ ২/৩৮০ পৃ: হা/৮৯৩০ ।
৩৪. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৬৩৩ ।
৩৫. বুখারী, হা/৩৫৪৭; মুসলিম হা/২৩৪৭; শামায়েলে তিরমিযী, পৃ: ১৪ ।
৩৬. বুখারী, হা/৫৯০৯ ।
৩৭. বুখারী হা/৫৯০৭ ।
৩৮. বুখারী, কিতাবুল-লিবাস, হা/৫৯১২ ।
৩৯. বুখারী, হা/৩৫৪৯; মুসলিম হা/২৩৩৭ ।
৪০. বুখারী, হা/৩৫৫২; তিরমিযী মানাক্বেব অধ্যায়, হা/৩৬৪০; শামায়েল ৯; দারেমী ১/৩২; আহামাদ ৪/২৮১ পৃ: ।
৪১. বুখারী, হা/৩৫৫৫; মুসলিম হা/১৪৫৯ ।
৪২. বুখারী, হা/৩৫৫৬; মুসলিম হা/২৭৬৯ ।
৪৩. ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৮৩৭ ।
৪৪. ইবনে সাদ ১/৩১৬ পৃ: ; মুখতাছারূছ ছহীহ মিনাশ শামায়েল পৃ: ৯ ।
৪৫. মুসলিম হা/২৩৪০ ; ইবনে সাদ ১/৩২০ পৃ: ; আহমাদ ৫/৪৫৪ পৃ: ।
৪৬. মুসলিম হা/২৩৩৯; তিরমিযী মানাক্বেব্ অধ্যায় হা/৩৬৪৯; শামায়েল ৭ আহামাদ ৫/৮৮ পৃ: ।
৪৭. মুসলিম হা/১৪৭৯; আবু ইয়ালা ১৬৪ ।
৪৮. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৬৩৩ ।
৪৯. বুখারী হা/২ ।
৫০. আবু নুআইম, ত্বাবারানী, শায়খ নাছিরুদ্দিন আলবানী, সিলসিলাহ ছহীহা হা/২০৮৮ ।
৫১. ছহীহ ইবনে হিব্বান হা/৬৩১৮ ।
৫২. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৬৩৩ ।
৫৩. মুসলিম হা/২৩৩৯; তিরমিযী হা/৩৬৪৭; মুসনাদে আহমাদ ৫/৮৬ ।
৫৪. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৬২১ ।
৫৫. সহীহুল জামে: হা/৪৮১৯ ।
৫৬. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৮২০ ।
৫৭. ছহীহ বুখারী হা/৫৯০৭ ।
৫৮. বায়হাক্বী, আহমাদ, সিলসিলাহ ছহীহা হা/২০৯৫ ।
৫৯. ইবনে সাদ ১/৩১৬, মুখতাছারু ছহীহ শামায়েল ৯; মুখতাছারু সীরাতুন্নাবী পৃ: ৬৯ ।
৬০. বুখারী হা/৩৫৬১; মুসলিম হা/২৩৩০; আহমাদ ৩/১০৭ ।
৬১. বুখারী হা/৩৫৫৩; আহমাদ ৪/৩০৯ ।
৬২. মুসলিম হা/২৩২৯ ।
৬৩. বুখারী হা/৩০৯; মুসলিম হা/৪৯৫ ।
৬৪. বুখারী হা/৩৫৬৫ ।
৬৫. বুখারী হা/৩৫৪৯; আবু দাউদ হা/৪১৮৩; তিরমিযী হা/১৭২৪ ।
৬৬. আহমাদ ৪/৬৯ পৃ: হা/১৬৭৫৭; নাসায়ী ৫/১৯৯ ।
৬৭. বায়হাক্বী, ছহীহুল জামিউছ ছাগীর হা/৪৬৩৩ ।

শামায়েলে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ( পর্ব-১)

শামায়েলে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ( পর্ব-১)

● মুহাম্মাদ হারূন আযীযী নদভী
‘শামায়েল’ বলতে ব্যক্তিগত আকার-আকৃতি, আচার-আচরণ ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। যা মানুষের পূর্ণাঙ্গ চরিত্র বা সীরাতের একটি অংশ মাত্র।
রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) এর ‘সীরাত’ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, সীরাত অধ্যয়ন করা, চর্চা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সকল মুসলিম নর-নারীর ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ্‌ তা’আলা ইরশাদ করেছেন,
كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا  ٣٣:٢١
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। [ সুরা আহযাব ৩৩:২১ ]
‘সীরাতে রাসুলুল্লাহ’ বিষয়টি অনেক ব্যাপক, এর অনেক দিক রয়েছে। সর্বদিক আলোচনা করে শেষ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সীরাত বিষয়ে অনেক লেখালেখি, বয়ান-বক্তৃতা, সভা-সমিতি, সেমিনার-সম্মেলন হয়েছে। এতকিছুর পরেও একথা বলা যায় না যে, সীরাতের ব্যাপারে লেখা-লেখি এবং প্রকাশ-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। না কখনো না, বরং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সীরাতের বিভিন্ন দিক তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। সুন্দরের চেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হচ্ছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশা-আল্লাহ।
প্রসিদ্ধ সীরাত গবেষক শ্রদ্ধেয় উস্তাদ আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র‘হিমাহুল্লাহ স্বীয় অনন্য সীরাত গ্রন্থ ‘আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ’-র ভূমিকায় বলেছেন,
“মহানবী (সাঃ) এর জীবনী অন্য নবী-রাসূল ও মহা-মনীষীদের জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর এ অকল্পনীয় ব্যাপকতা, জটিলতা ও খুঁটিনাটি বিষয়ের এ সুবিস্তারিত বর্ণনায় তার আখলাক ও চরিত্রের অপূর্ব বিবরণ পাওয়া যায়।”
সীরাত ও শামায়েল গ্রন্থসমূহ যা কিছু সংকলন ও সংরক্ষণ করে আমাদের দিয়েছে (সীরাত ও শামায়েল লেখকদের যাবতীয় প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিনয়ের সাথে বলতে হয়) এটা তার সুবিশাল সীরাতের অপরূপ শোভা-সৌন্দর্যের ও সুমহান নবুওয়াতের যে পরিপূর্ণতা দিয়ে আল্লাহ্‌ পাক তাকে মহিমান্বিত করেছিলেন, তার এক সামান্য ঝলকমাত্র। [সূত্র: ১]
সীরাতুন্নবীর বিশেষ একটি অংশ হল শামায়েলে নববী। অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর শারীরিক আকার আকৃতি, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, শয়ন-জাগরণ, খানা-পিনা, লেন-দেন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, মানুষের সাথে মেলা-মেশা, ইবাদত-বন্দেগী, যিকর-আযকার এবং দো’আ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে তার আদত-অভ্যাস সম্পর্কে সম্যক আলোচনা। সীরাত ও শামায়েল সম্পর্কে জানার জন্য পবিত্র কুরআন মাজীদের বাস্তব রূপই হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র মাধুর্য তথা পবিত্র সীরাত। উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ)-কে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন,
‘তার চরিত্র-মাধুর্য ছিল পবিত্র কুরআন মাজীদ’। [সূত্র: ২] 
সীরাত-শামায়েলের কোন একটি অংশও কোন রকমের মনগড়া বর্ণনা বা বানোয়াট কল্প কাহিনীর মুখাপেক্ষী নয়। আল্লামা নদভী (রঃ) বলেছেন,
‘মহানবী (সাঃ) এর সীরাত রচনা করতে কোন প্রকার কিয়াস-অনুমান ও মনগড়া সব নিয়ম-নীতির অনুসরণ ও এর উপর নির্ভর করার আদৌ প্রয়োজন নেই, যার প্রয়োজন পৃথিবীর মহা-মনীষীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। কারণ মহানবী (সাঃ) এর জীবনী আর সব মনীষীর জীবনীর চেয়ে পরিপূর্ণ, ঐশ্বর্যময় ও অপরূপ শোভামণ্ডিত। উৎসমূল কুরআন পাকের তাবৎ সুস্পষ্ট বর্ণনা, ইতিহাসের অনস্বীকার্য সাক্ষ্য, তার আখলাক-চরিত্রের খুঁটি-নাটি বিষয়ের সুবিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান, যার অধিক কল্পনা করা যায় না’। [সূত্র: ৩] 
তিক্ত হলেও সত্য যে, হাদীছে রাসুলের অন্যান্য বিষয়ে যেমন কুমতলবীরা অনেক মনগড়া কল্পকাহিনী ও বানোয়াট কথা-বার্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে, তদ্রুপ সীরাত-শামায়েলের ব্যাপারেও অনেক জাল-মওযু কথা-বার্তা লোকালয়ে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলি যাচাই-বাছাই করে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর ছহীহ-শুদ্ধ সীরাত সংরক্ষণ করা এবং নির্ভেজালভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সময়ের সুমহান দাবী এবং বিজ্ঞ আলেম-ওলামার গুরুদায়িত্ব। আমি এখানে সীরাতের বিশেষ একটি দিক ‘শামায়েলে নববী’ সম্পর্কে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে কিছু আলোকপাত করতে চাই।

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ
১. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নিজের বংশ পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহ্‌ তা’আলা ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর থেকে কিনানা গুত্রকে বাছাই করেন, কিনানা গুত্র থেকে কুরাইশকে বাছাই করেন এবং বনূ হাশিম থেকে আমাকে বাছাই করেন। [সূত্র: ৪]
২. হুনাইন যদ্ধ প্রসঙ্গে বর্ণিত এক হাদীছে হযরত বারা বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি নবী, কোন মিথ্যুক নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান’। [সূত্র: ৫]
৩. আব্দুল-মুত্তালিব ইবনে আবু ওয়াদাআহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহ এর সন্তান। আল্লাহ্‌ তা’আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যে উত্তমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তিনি তার সৃষ্টিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার উত্তম দল থেকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কতক গোত্রে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার উত্তম গোত্র থেকে পয়দা করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কতক পরিবারে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যকার সবচেয়ে উত্তম পরিবারে পয়দা করেছেন। অতএব, আমি ব্যক্তি সত্তায় তোমাদের চেয়ে উত্তম এবং বংশ মর্যাদায় সবার চাইতে উত্তম’। [সূত্র: ৬]
৪. মুহাম্মাদ ইবনু আলী থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্‌ পাক আমাকে বিবাহ থেকে সৃষ্টি করেছেন, যেনা-ব্যভিচার থেকে নয়’। [সূত্র: ৭]
৫. হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি বিবাহের মাধ্যমে পয়দা হয়েছি, যেনা-ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়। জাহেলী যুগের ব্যভিচার আমাকে কোন সম্পর্ক করেনি’। [সূত্র: ৮]
৬. হযরত আবু মাসউদ বদরী ও জাবীর ইবনু আব্দিল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে এসে কথা বলছিল, তখন সে ভয়ে কাঁপছিল, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তুমি স্থির হও (ভয় কর না) আমি কোন সম্রাট নই, আমি কুরাইশ বংশীয় এক মহিলার সন্তান, যে শুকনো গোসত খেত’। [সূত্র: ৯]
৭. কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) এর তিনজন দাদী ছিলেন, সবার নাম ছিল ‘আতেকা’। যখন গর্ব করে কিছু বলতেন তখন বলতেন, আমি ‘আতেকা’ সমূহের সন্তান। [সূত্র: ১০]
৮. হযরত খালেদ ইবনে মা’দান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আমার পিতা ইবরাহীম (আঃ) এর দো’আ, ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। যখন সে আমাকে গর্ভ ধারণ করেছিল, ‘তখন সে দেখেছে যে তার থেকে একটি আলো বের হল, যা সিরিয়া দেশের প্রাসাদগুলিকে আলোকিত করেছে’। [সূত্র: ১১]
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছহীহ বর্ণনা মতে রবী’উল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ সোমবার হস্তিবাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে তার কয়েকটি বক্তব্য পেশ করা হলঃ
৯. আবু কাতাদা (রাঃ) বলেন, এক বেদুইন এসে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! সোমবার ছিয়াম সম্পর্কে আপনার কি মত? উত্তরে তিনি বললেন, ‘সোমবার হল সেই দিন, যে দিনে আমি পয়দা হয়েছি এবং আমার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’। [সূত্র: ১২]
১০. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হস্তি বাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেছেন’। [সূত্র: ১৩]
১১. কায়স ইবনে মাখরামা (রাঃ) বলেন, ‘আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হস্তি বাহিনীর হামলার বছর জন্মগ্রহণ করেছি’। [সূত্র: ১৪]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহঃ
কুরআন-হাদীছ পর্যালোচনা করলে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর অনেক নামের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এগুলির নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা কোন ছহীহ হাদীছে পাওয়া যায় না। একটি ছহীহ হাদীছে পাঁচ নামের কথা বর্ণিত থাকলেও অন্য এক বর্ণনায় পাঁচের অধিক নামের সন্ধান পাওয়া যায়। ইমাম নববী (রঃ) আবূবকর ইবনুল আরাবী আল-মালেকীর বরাত দিয়ে বলেন যে,
‘আল্লাহ্  তা‘আলার এক হাজার নাম রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-রও এক হাজার নাম রয়েছে। ইবনুল আরাবী অন্তত ৬৩টি নাম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন’। [সূত্র: ১৫]
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেন, ‘মুহাদ্দিছ ইবনে দেহয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহ সম্পর্কে রচিত তার কিতাবে বলেছেন, কেউ কেউ মনে করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নামও আল্লাহ্‌ পাকের আসমায়ে হুসনার ন্যায় ৯৯টি। কেউ রিসার্চ করলে তা তিন শত পর্যন্ত পৌঁছবে’। [সূত্র: ১৬] কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম সমূহ সম্পর্কে ৯৯ অথবা তিনশত অথবা এক হাজার সংখ্যার উল্লেখ কোন ছহীহ হাদীছে দেখিনি। এ জন্যই মনে হয় কোন কোন আলেম নবীর ৯৯ নামের কথাটিকে বিদ’আতী উক্তি আখ্যা দিয়েছেন। ইয়েমেনের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ আল্লামা মুকবিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেয়ী বলেন,
‘কুরআন মাজীদের বিভিন্ন কপিতে যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নামের সংখ্যার গণনা ৯৯ পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে তা বিদ’আতী উক্তি’। [সূত্র: ১৭] তবে এটা সত্য যে, সব নাম না হলেও বেশ কিছু নামের উৎস কুরআন মাজীদের আয়াত এবং কোন কোন ছহীহ হাদীছে ইশারা-ইঙ্গিতে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। বিস্তারিত গবেষণা করে এগুলি বের করতে হলে, এই বিষয়ে বড় ধরনের একটি বই রচনা করতে হবে। এখানে ছহীহ-শুদ্ধ হাদীছের আলোকে কয়েকটি নামের উল্লেখ করা হল:
১. হযরত যুবাইর ইবনে মুতঈম (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ ও আহমাদ। আমি আলমাহী, আমার দ্বারা আল্লাহ্‌ পাক কুফরকে নিশ্চিহ্ন করেন। আমি আল-হাশির, কিয়ামতের দিন আমার পশ্চাতে মানব জাতিকে সমবেত করা হবে এবং আমি আল-আকিব (শেষ আগমনকারী), আমার পর আর কোন নবী আসবে না’। [সূত্র: ১৮]
২. হযরত যুবাইর ইবনে মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আহমাদ, হাশির, আকিব, মাহী এবং খাতম’। [সূত্র: ১৯]
৩. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কাছে অনেক নাম উল্লেখ করেছেন, বলেছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আহমাদ, মুকাফফী, হাশির, নবীয়্যুত তওবা এবং নবীয়্যুর রহমাহ’। অন্য বর্ণনায় আছে ‘নবীয়্যুল মালহামাহ’। [সূত্র: ২০]
৪. হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি মদীনার রাস্তা অতিক্রম করছিলাম হঠাৎ শুনতে পেলাম যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলছেন, ‘আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, নবীয়্যুর রহমাহ, নবীয়্যুত তওবাহ, হাশির, মুকাফফী, নবীয়্যুল মালাহিম’। [সূত্র: ২১]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উপনামঃ
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রসিদ্ধ উপনামসমূ হল আবুল কাসিম। কোন কোন বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, পরে তাকে আবূ ইবরাহীমও বলা হতো।
১. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বাজারে ছিলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আবুল কাসেম! নবী (সাঃ) সেদিকে তাকালেন (এবং বুঝতে পারলেন লোকটি অন্য কাউকে ডাকছে), অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা আমার নামে নাম রাখো, উপনাম ধরে আমাকে ডেকো না। [সূত্র: ২২]
২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি আবুল কাসেম। আল্লাহ্‌ দান করেন আর আমি বণ্টন করে থাকি’। [সূত্র: ২৩]
৩. আনাস (রাঃ) বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রনণ করলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) এসে বললেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা ইবরাহীম’। [সূত্র: ২৪]

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর শারীরিক গঠন ও আকৃতিঃ
১. হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট দীর্ঘকায়ও ছিলেন না, আর খর্বকায়ও ছিলেন না। ধবধবে শুভ্র বর্ণও ছিলেন না, আর বাদামীও ছিলেন না। অত্যধিক কুঞ্চিত কেশবিশিষ্টও ছিলেন না। তার বয়স যখন চল্লিশ বছর হয়, তখন আল্লাহ্‌ পাক তাকে নবুওয়াত প্রদান করেন, অতঃপর মক্কায় দশ বছর এবং মদীনাতে দশ বছর অবস্থান করেন। তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে ওফাৎ দেন। ওফাৎকালে তার মাথায় এবং দাড়িতে বিশটি চুলও সাদা হয়নি’। [সূত্র: ২৫]
২. হযরত আনাস (রাঃ) আরও বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন মধ্যম উচ্চতা-বিশিষ্ট, না দীর্ঘ আর না বেঁটে। সুন্দর ছিল তার শারীরিক গঠন। আর তার চুল অত্যধিক কুঞ্চিতও ছিল না এবং একেবারে সটান সোজাও ছিল না। তিনি গৌরবর্ণ ছিলেন। পথে হাঁটার সময় তিনি সম্মুখে ঝুঁকে দ্রুত চলতেন’। [সূত্র: ২৬]
৩. হযরত বারা ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) মধ্যম আকৃতির লম্বা ছিলেন। তার দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান বেশ প্রশস্থ ছিল। [সূত্র: ২৭]
৪. হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাঃ) লম্বাও ছিলেন না, আবার একেবারে বেঁটেও ছিলেন না। হাতের তালুদ্বয় ও পদতলদ্বয় এবং আঙ্গুলগুলি মাংসল ছিল। মস্তক বৃহৎ এবং অস্থিগ্রস্থগুলি মোটা ছিল। লোমের একটি সরু রেখা বক্ষ থেকে নাভি পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। পথ চলা কালে এমনভাবে সম্মুখে ঝুঁকে দ্রুত হাঁটতেন যেন কোন নিম্নস্থানে নামছেন। তার অনুরূপ কাউকেও আমি তার পূর্বে দেখিনি, তার পরেও দেখিনি, আল্লাহ্‌ পাক তার উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন’। [সূত্র: ২৮]

(চলবে ইনশা-আল্লাহ…)
——————————————————————
তথ্যসূত্র:
* খতীব, আলী মসজিদ, বাহরাইন।
১. আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ-র ভূমিকা, পৃঃ ১৬,১৭; নবীয়ে রহমত, পৃঃ ২৩ ।
২. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/৪৮১১ ।
৩. আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, পৃঃ ১৬; নবীয়ে রহমত, পৃঃ ২৩ ।
৪. মুসলিম হা/২২৭৬; তিরমিযী হা/৩৬০৬; মুসনাদ আহমাদ ৪/১০৭ পৃঃ, হা/১৭১১১ ।
৫. বুখারী হা/২৯৩০; মুসলিম হা/১৭৭৬ ।
৬. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/১৪৭২; মিশকাত, তাহকীক আলবানী হা/৫৭৫৭ ।
৭. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর হা/১৭০৩; আল-সুনানুল কুবরা ৭/১৯০ পৃঃ হা/১৪০৭৬ ।
৮. ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর, হা/৩২২৫; আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনে কাছীর, তাহকীকঃ আলবানী পৃঃ ১০; ইরওয়াউল গালীল হা/১৯১৪ ।
৯. সুনান ইবনু মাজাহ হা/৩৩১২; মুস্তাদরাক হাকেম ২/৫৪৮ পৃঃ হা/৩৭৯০; সিলসিলা ছহীহা হা/১৮৭৬ ।
১০. বায়হাকী তাবরানী, ইবনু আসাকির, সিলসিলাহ ছহীহা, হা/১৫৬৯, ছহীহ আল-জামিউছ ছাগীর, হা/১৪৪৬ ।
১১. সিলসিলা ছহীহা, হা/১৫৪৫; মুস্তাদরাক ২/৭০৫ পৃঃ, হা/৪২৩৩ ।
১২. মুসলিম হা/১১৬২, মুস্তাদরাক হাকেম ২/৭০৭ পৃঃ, হা/৪২৩৮ ।
১৩. মুস্তাদরাক ২/৭০৭ পৃঃ হা/৪২৩৯, ইবনে কাছীর, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, পৃঃ ১৩।
১৪. মুস্তাদরাক ২/৭০৮ পৃঃ, হা/৪২৪২, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ পৃঃ ১৩।
১৫. শরহ মুসলিম ১৫/১০৪ পৃঃ ।
১৬. হাফেয ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৬/৬৮২ পৃঃ ।
১৭.আল-জামিউছ ছাহীহ ৩/৩৭১ পৃঃ ।
১৮. বুখারী, কিতাবুল মানাক্বিব হা/৩৫৩২; কিতাবুত তাফসীর হা/৪৮৯৬; মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল হা/২৩৫৪; তিরমিযী, কিতাবুল আদব হা/২৮৪০; সহীহ আল-বুখারী আরবী-বাংলা; ৩/৪৩৬ পৃ:, হা/৩২৬৮।
১৯. মুসনাদে আহমাদ ৪/৮১. ৮৪ পৃ:, হা/১৬৮৬৯, ১৬৮৯২।
২০. মুসলিম হা/২৩৫৫; মুসনাদে আহমাদ ৪/৪০৪ পৃ:, হা/১৯৮৫০, ৪/৩৯৫ পৃ:, হা/১৯৭৫৪; মুস্তাদরাক-হাকেম ২/৭০৯ পৃ: হা/৪২৪৪।
২১. মুসনাদে আহমাদ ৫/৪০৫ পৃ: হা/২৩৮৩৮, আল-জামিউস সহীহ, শায়খ মুকবিল ইবনে হাদী আর-ওয়াদেয়ী ৩/৩৭১ পৃ: ইবনু হিব্বান, হা/৬৩২৪।
২২. বুখারী হা/৩৫৩৭; মুসলিম হা/২১৩১।
২৩. মুস্তাদরাক ২/৭০৯ পৃ: হা/৪২৪৬, সহীহুল জামিউস সাগীর হা/১৪৪৭।
২৪. মুস্তাদরাক হাকেম ২/৭১০ পৃ:, হা/৪২৪৭।
২৫. বুখারী হা/৩৫৪৮; মুসলিম হা/২৩৩৭; শামায়েলে তিরমিযী, তাহক্বীক: শায়খ আলবানী, পৃ: ১৩, হা/১।
২৬. বুখারী, হা/৩৫৪৭, মুসলিম হা/২৩৪৭, শামায়েলে তিরমিযী, পৃ: ১৪।
২৭. বুখারী, হা/৩৫৫১, মুসলিম, হা/২৩৩৭।
২৮. তিরমিযী, হা/৩৬৪১; মুস্তাদরাক ২/৬০৬ পৃ: মুসনাদে আহমাদ ১/৯৬ পৃ: হা/৭৪৬; শামায়েলে তিরমিযী, পৃ: ১৫, হা/৪।

Thursday, November 23, 2017

একটি শিক্ষণীয় (বাস্তব) ঘটনা!

মালেক বিন আনাস রহি:
এক যুবক পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক যুবতীর প্রশংসা শুনে তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে না দেখেই বিয়ে করেন। স্ত্রীকে বাসর ঘরেই প্রথম দেখেন। কিন্তু স্ত্রীর ঘোমটা খুলতেই তিনি মনোবেদনায় বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। তিনি দেখেন যে, তার পরম কাঙ্ক্ষিত স্ত্রী রূপসী নয়, বরং কালো। তাই তিনি স্ত্রীর কক্ষ ত্যাগ করেন। মনের দুঃখে তিনি স্ত্রীর কাছে আর ফিরে আসেন না।

যুবকটির নাম আমের বিন আনাস। অবশেষে স্ত্রী নিজেই তার কাছে যান।
প্রিয় স্বামীকে বলেনঃ "ওহে প্রাণের স্বামী! তুমি যা অপছন্দ করছ, হয়তো তাতেই তোমার কল্যাণ নিহিত আছে, এসো…।

অতঃপর আমের স্ত্রীর কাছে যান এবং বাসর রাত যাপন করেন। কিন্তু দিনের বেলায় স্ত্রীর অসুন্দর চেহারার প্রতি তাকাতেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। মনের দুঃখে আমের এবার বাড়ি থেকেই চলে যান। চলে যান বহু দূরে অন্য শহরে।

কিন্তু বাসর রাতেই যে তার স্ত্রী গর্ভধারণ করেছেন, এ খবর তার জানা ছিল না। আমের ভিনদেশে বিশ বছর কাটান। বিশ বছর পর তিনি নিজ শহরে ফিরে আসেন। এসেই প্রথমে নিজ বাড়ির কাছের সেই প্রিয় মসজিদে ঢোকেন।

ঢুকেই দেখেন এক সুদর্শন যুবক পবিত্র কুরআনের মর্মস্পর্শী দরস পেশ করছেন, আর বিশাল মসজিদ ভরা মুসল্লিগণ পরম আকর্ষণে তা হৃদয়ে গেঁথে নিচ্ছে। তাঁর হৃদয়গ্রাহী দরস শুনে আমেরের অন্তর বিগলিত হয়ে যায়।

আমের লোকদের কাছে এই গুণী মুফাসসিরের নাম জানতে চাইলে লোকেরা বলেন, ইনি ইমাম মালেক। আমের আবার জানতে চান ইনি কার ছেলে? লোকেরা বলেন, উনি এই এলাকারই আমের বিন আনাস নামের এক ব্যক্তির ছেলে। বিশ বছর আগে তিনি বাড়ি থেকে চলে গেছেন আর ফিরে আসেননি।

আবেগে উত্তাল আমের ইমাম মালেকের কাছে এসে বললেন, আমাকে আপনার বাড়িতে নিয়ে চলুন। তবে আমি আপনার মায়ের অনুমতি ছাড়া আপনার ঘরে প্রবেশ করবো না। আমি আপনার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবো, আপনি ভেতরে গিয়ে আপনার মাকে বলবেন, দরজায় একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি বলছেনঃ

"তুমি যা অপছন্দ করছ, হয়তো তাতেই তোমার কল্যাণ নিহিত আছে।"
এ কথা শুনেই ইমাম মালেকের মা বললেন,
"হে মালেক! দৌঁড়ে যাও, সম্মানের সাথে উনাকে ভেতরে নিয়ে এসো, তিনিই তোমার বাবা। দীর্ঘদিন দূর দেশে থাকার পর তি নি ফিরে এসেছেন।"

সুবহানাল্লাহ!
এই হলেন সেই গুণবতী মা, যিনি ইমাম মালেকের মতো সন্তান গড়ে তোলার কারিগর....।
সুতরাং রূপবতী নারীতে নয় গুণবতী ও সৎ চরিত্রবান নেককার নারীদের দ্বারাই  এমন সন্তানের জন্ম নেয়।